সুজন দাস:
বিদ্যা, বুদ্ধি ও জ্ঞানের দেবী মা সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায় এখন উৎসবের আমেজ। সরস্বতী পূজা সামনে রেখে উপজেলার বিভিন্ন মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এ পূজাকে ঘিরে সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। দিন-রাত পরিশ্রম করে তারা তৈরি করছেন নানান আকার ও নকশার সরস্বতী প্রতিমা। আগামী ৩০ জানুয়ারী রোজ শুক্রবার সারা দেশে সরস্বতী পূজা অনুষ্টিত হবে।
হাজীগঞ্জ উপজেলার হাজীগঞ্জ বাজারস্থ শ্রী শ্রী জমিদার বাড়ি দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গণ এবং হাজীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস রোডের সামনের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি প্রতিমা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। রং, নকশা ও অলংকরণে প্রতিটি প্রতিমাই আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করছে। প্রতিমাগুলোর সামনে ভিড় করছেন মন্দির কমিটির সদস্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পূজা উদযাপন কমিটির প্রতিনিধিরা। কেউ পছন্দ করছেন প্রতিমা, কেউ আবার দরদাম করছেন।
এ বছরও শরীয়তপুর জেলা থেকে হাজীগঞ্জে এসে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পী গৌতম পাল। তিনি প্রতি বছরই সরস্বতী পূজার মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় মন্দির প্রাঙ্গণ ভাড়া নিয়ে প্রতিমা তৈরি করে থাকেন। গৌতম পাল জানান, প্রতিবছর নির্ধারিত একটি ভাড়া ও অনুমতির মাধ্যমে তিনি নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিমা তৈরির কাজ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় এ বছর হাজীগঞ্জ উপজেলার হাজীগঞ্জ বাজারের শ্রী শ্রী জমিদার বাড়ি দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গণে তিনি প্রতিমা তৈরির কারখানা স্থাপন করেছেন।
গৌতম পাল বলেন, “সরস্বতী পূজা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়েই বছরের বড় একটি অংশের আয় হয়। এবছরও দেড় মাস আগে থেকে কাজ শুরু করেছি। দিনরাত পরিশ্রম করে প্রতিমা তৈরি করছি যেন সময়মতো সবাই তাদের পছন্দের প্রতিমা পায়।”

অপরদিকে হাজীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস রোডের একটু সামনে স্থানীয় মৃৎশিল্পী স্বপন সাহা তার দুই ছেলে নিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ছোট একটি কারখানায় সারি সারি সরস্বতী প্রতিমা তৈরি করে সাজিয়ে রেখেছেন তারা। পরিবারভিত্তিক এই শিল্পকর্মে বাবার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে তার ছেলেরাও।
মৃৎশিল্পী স্বপন সাহা জানান, এবছর তিনি প্রায় শতাধিক প্রতিমা তৈরি করেছেন। প্রতিমার আকার ও নকশা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ছোট প্রতিমার দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে বড় ও সুসজ্জিত প্রতিমার দাম সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিমা তৈরিতে মাটির কাজ, শুকানো, রং করা ও সাজসজ্জা—সব মিলিয়ে অনেক সময় ও শ্রম লাগে। আমরা তিনজন কর্মচারী নিয়ে দেড় মাস ধরে কাজ করছি।”
প্রতিমা তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। প্রথমে খড় ও বাঁশ দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমার আকৃতি দেওয়া হয়। শুকানোর পর শুরু হয় রং ও অলংকরণের কাজ। প্রতিটি প্রতিমাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীদের প্রয়োজন হয় ধৈর্য ও দক্ষতার।
স্থানীয় কয়েকটি পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা জানান, এ বছর হাজীগঞ্জে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মন্দির মিলিয়ে আগের তুলনায় বেশি সংখ্যক সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। ফলে প্রতিমার চাহিদাও বেড়েছে। অনেকেই আগে থেকেই অর্ডার দিয়ে রেখেছেন।
হাজীগঞ্জের এক কলেজ শিক্ষক বলেন, “সরস্বতী পূজা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সুন্দর প্রতিমা ছাড়া পূজার আনন্দ পূর্ণতা পায় না। তাই আমরা চেষ্টা করি স্থানীয় শিল্পীদের কাছ থেকেই প্রতিমা নিতে।”
মৃৎশিল্পীরা আশা করছেন, শেষ পর্যন্ত সব প্রতিমা বিক্রি হলে তারা কিছুটা লাভবান হবেন। তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও শ্রম খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ আগের তুলনায় কম বলে তারা জানান। তারপরও ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং জীবিকার তাগিদে তারা এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন।
সব মিলিয়ে সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে হাজীগঞ্জে এখন উৎসবের প্রস্তুতি ও ব্যস্ততার চিত্র স্পষ্ট। মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি প্রতিমার মধ্য দিয়েই আগামী দিনে হাজীগঞ্জে বিদ্যার দেবীর আরাধনা অনুষ্ঠিত হবে উৎসবমুখর পরিবেশে।