জুলাই মাস এলেই চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার মোহনায় শুরু হয় ইলিশের ভরা মৌসুম। এ সময় নদীতে জেলেদের ব্যস্ততা, মাছঘাটে হাজার হাজার মণ ইলিশের বেচাকেনা আর ক্রেতাদের ভিড়-এটাই ছিল চিরচেনা দৃশ্য। কিন্তু এবার সেই চিত্র পাল্টে গেছে। ভরা মৌসুমেও নদী ও সাগরে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না। দেশের অন্যতম বৃহৎ ইলিশের পাইকারি বাজার চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে এখন ইলিশের সরবরাহ কমে গেছে কয়েক গুণ। সংকটের কারণে বাজারে দামও উচ্চপর্যায়েই রয়েছে।
এ অবস্থায় ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর বিশেষজ্ঞরা সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে চাঁদপুরে এসে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেন।

প্রথমে তারা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে চাঁদপুর সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুকসহ অন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জেলার জেলের সংখ্যা, সরকারি সহায়তা, প্রণোদনা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেন।
মির্জা ওমর ফারুক বিশেষজ্ঞ দলের কাছে বলেন, চাঁদপুর নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় এখানে জেলের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তবে অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, নদীদূষণ এবং মেঘনা নদীতে বিভিন্ন ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণ উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে আমরা মনে করি।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য সংগ্রহ শেষে বিশেষজ্ঞ দল যায় দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে। সেখানে তারা ইলিশ ব্যবসায়ী, আড়তদার, জেলে এবং ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। বাজার ঘুরে তারা দেখতে পান, ভরা মৌসুমেও মাছঘাটে ইলিশের সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কম।
ব্যবসায়ীরা জানান, অন্য বছর এ সময়ে প্রতিদিন এক হাজার থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ কেনাবেচা হতো। কিন্তু এবার প্রতিদিন ১০০ মণ ইলিশও বাজারে আসছে না। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। গত বছর এ সময়ে এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে একই আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়।
চাঁদপুর মাছঘাটের ইলিশ ব্যবসায়ী ও মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারি মানিক জমাদার বলেন, সরকার ইলিশ রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জাটকা সংরক্ষণ, মা ইলিশ রক্ষা, জেলেদের খাদ্যসহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন বাড়ছে না। আমাদের ধারণা, নানা কারণে সাগর থেকে পর্যাপ্ত ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। পাশাপাশি ইলিশের চাহিদাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে সরবরাহ কম থাকায় দামও কমছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, নদীতে মৎস্য সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। বরং অনেক সময় জেলে ও ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ২০০৭ সাল থেকে জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচির আওতায় নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে খাদ্যসহায়তা, প্রণোদনা এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন প্রয়োগ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও প্রত্যাশিত উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়ায় নতুন করে কারণ অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে বিশেষজ্ঞ দল।
ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা দেখছি, আগের তুলনায় ইলিশের সরবরাহ অনেক কম। বাজারে বড় ইলিশের চেয়ে ছোট ইলিশের সংখ্যাই বেশি। তবে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। নদীর পরিবেশ, পানির প্রবাহ, প্রাকৃতিক পরিবর্তন, মাছের চলাচলের পথসহ বিভিন্ন বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। সব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার পর ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ এবং করণীয় বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে একটি সুপারিশভিত্তিক প্রতিবেদন দেয়া হবে।

























