রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ও হাজীগঞ্জের কৃতী সন্তান মোহাম্মদ সাইফুল মালিক। ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ভোর ৫টা ২২ মিনিটে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর অকাল প্রয়াণে জন্মভূমি হাজীগঞ্জসহ সমগ্র চাঁদপুরে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। পরিবার, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সাধারণ মানুষের চোখে ছিল অশ্রু আর হৃদয়ে ছিল প্রিয় মানুষটিকে হারানোর বেদনা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন সাইফুল মালিক। প্রথমে কুমিল্লা মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার গ্রিন লাইফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করে অস্ত্রোপচার করা হলেও চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার বাদ যোহর রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের উদ্যোগে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁর কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
একই দিন বাদ আসর কুমিল্লায় তাঁর কর্মস্থলে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সহকর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রিয় কর্মকর্তাকে শেষ বিদায় জানান। পরে মরদেহ নিয়ে আসা হয় তাঁর প্রিয় জন্মভূমি হাজীগঞ্জে।
শুক্রবার বাদ জুমা হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় জানাজা। জানাজায় চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হক, জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি এবং হাজারো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশ নেন। শোকাবহ পরিবেশে জানাজা শেষে চাঁদপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে পুনরায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
এরপর তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নিজ গ্রাম হাজীগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর পশ্চিম বড়কুল ইউনিয়নের নাটেহরা গাজী বাড়ি জামে মসজিদে। সেখানে চতুর্থ জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা মরহুম আবুল কালামের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। দাফনের সময় স্বজনদের আহাজারি আর এলাকাবাসীর অশ্রুসিক্ত বিদায়ে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
১৯৮১ সালে জন্মগ্রহণকারী মোহাম্মদ সাইফুল মালিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০০৫ সালে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ৩৪তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও মানবিক আচরণের জন্য তিনি সহকর্মী এবং সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মৃদুভাষী ও মানবিক একজন মানুষ। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সহানুভূতিশীল আচরণের জন্য তিনি ছিলেন সবার কাছে প্রিয় মুখ।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই সন্তান, মা, তিন ভাই, এক বোনসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। তাঁর একমাত্র ছেলে ইলহান মালিকের বয়স ১০ বছর এবং মেয়ে আয়রা মালিকের বয়স মাত্র ৫ বছর। তিনি হাজীগঞ্জ বাজারের ট্রাক রোড এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং উপজেলার ৭ নম্বর পশ্চিম বড়কুল ইউনিয়নের নাটেহরা গ্রামের মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালামের সন্তান।
সাইফুল মালিকের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই হাজীগঞ্জ, কুমিল্লা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শোকের আবহ সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি প্রকাশ করে হাজারো মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং মহান আল্লাহর কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। অনেকেই তাঁকে একজন সৎ, দক্ষ, দায়িত্বশীল ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে স্মরণ করেন।
একজন মেধাবী, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ পুলিশ কর্মকর্তার এমন অকাল বিদায় শুধু তাঁর পরিবারের নয়, বাংলাদেশ পুলিশ এবং সমগ্র হাজীগঞ্জবাসীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর কর্ম, সততা ও মানবিকতার স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
























