ঢাকা ০৯:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

১২ ফেব্রুয়ারি জেন–জির হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৩৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৯ Time View

অনলাইন ডেস্ক :

দীর্ঘ ১৫ বছরের একচেটিয়া শাসনের পর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠে ফিরেছে উত্তাপ, প্রতিযোগিতা।আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে জেন–জি প্রজন্ম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়ে ওঠা, প্রশ্ন করতে শেখা এই তরুণ ভোটারদের হাত ধরেই বিশ্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে একটি ‘জেন–জি অনুপ্রাণিত’ ভোট হতে যাচ্ছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।

আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে বাদ পড়ায় পুরো রাজনৈতিক সমীকরণই পাল্টে গেছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা বিরোধী রাজনীতি পেয়েছে নতুন প্রাণ ।রাজপথ ও পোস্টারে ভরে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের উপস্থিতিতে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ক্ষমতার লড়াই নয় ,এটি পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বনাম নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার মুখোমুখি পরিবর্তন।

এই নির্বাচন শুধু কে সরকার গঠন করবে তা নির্ধারণ করবে না; এটি ঠিক করে দেবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং ভারত–চীন পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথ।

২০০৯–২০২৪ আকস্মিক পরিবর্তন:
২০০৯ সালের পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এমন একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে, যেখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেই, রাজপথে একক আধিপত্য ভেঙে পড়েছে, আর তরুণ ভোটাররা রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ১৫ বছরের টানা শাসনের পর এই নির্বাচন অনেকের কাছে ‘নতুন যুগের সূচনা। ভোটারদের বড় অংশ চাচ্ছে ২০০৯–২০২৪ একটানা ক্ষমতা থেকে আকস্মিক পরিবর্তন

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। বিরোধী রাজনীতি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে কখনও নির্বাচন বর্জন, কখনও শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, কখনও গণসমাবেশে বাধা। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন থাকলেও প্রতিযোগিতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতায় ইতিটানে। ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে, রাজনীতির মাঠে ফেরে বহুদিনের চাপা ক্ষোভ। তারই ধারাবাহিকতায় এবার এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন ২০০৯ সালের পর প্রথম সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন।

এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে মাঠে নেমেছে বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দাবি, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বিএনপি এবং সরকার গঠনের মতো আসন পাবে তারা। তবে এই পথ মোটেও মসৃণ নয়।

ইসলামপন্থী উত্থান:
ইসলামপন্থী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট এবার শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে। শুধু তাই নয়, জেন–জি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি পর্যাপ্ত সমর্থন না পেয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচন কার্যত দুটি রাজনৈতিক ধারার মুখোমুখি। একদিকে জাতীয়তাবাদী দল অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান।

ঢাকার অলিগলি থেকে জেলা শহর সবখানেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। যেখানে একসময় আওয়ামী লীগের পোস্টার ও ব্যানারে ভরা থাকত রাজপথ, সেখানে এখন চোখে পড়ছে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতীক।

ভূরাজনীতি:
এই নির্বাচন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। শেখ হাসিনার ক্ষমতার পতনের পর ভারতের প্রভাব ব্যাপক কমেছে চীনের উপস্থিতি বেড়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথে হাঁটতে চাইবে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং চীনের সঙ্গেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রাখা। অন্যদিকে জামায়াত পাকিস্তানমুখী নীতি গ্রহণ করতে পারে, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।

অর্থনীতি:
রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতিও এবারের নির্বাচনের বড় ফ্যাক্টর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, বিনিয়োগ স্থবিরতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বেড়েছে।
ভোটারদের কাছে দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি এখন প্রধান ইস্যু। মানুষ চায় এমন সরকার, যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং পকেটের চাপ কমাবে।

জেন–জি: নীরব শক্তি, বড় ভূমিকা
৩০ বছরের কম বয়সী তরুণরাই এবার নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম রাজনীতি নিয়ে কথা বলছে, প্রশ্ন তুলছে, তুলনা করছে। তারা দল নয়, নীতি দেখতে চায়।প্রথমবারের ভোটার মোহাম্মদ রাকিব বলেন,
সবাই আওয়ামী লীগে ক্লান্ত। যে সরকারই আসুক, তারা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।

১২ ফেব্রুয়ারির ভোট শুধু সরকার নির্ধারণ করবে না। এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। সফল হলে এটি গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, ব্যর্থ হলে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হতে পারে।

সংগ্রহিত

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

১২ ফেব্রুয়ারি জেন–জির হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

Update Time : ১১:৩৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক :

দীর্ঘ ১৫ বছরের একচেটিয়া শাসনের পর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠে ফিরেছে উত্তাপ, প্রতিযোগিতা।আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে জেন–জি প্রজন্ম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়ে ওঠা, প্রশ্ন করতে শেখা এই তরুণ ভোটারদের হাত ধরেই বিশ্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে একটি ‘জেন–জি অনুপ্রাণিত’ ভোট হতে যাচ্ছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।

আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে বাদ পড়ায় পুরো রাজনৈতিক সমীকরণই পাল্টে গেছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা বিরোধী রাজনীতি পেয়েছে নতুন প্রাণ ।রাজপথ ও পোস্টারে ভরে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের উপস্থিতিতে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ক্ষমতার লড়াই নয় ,এটি পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বনাম নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার মুখোমুখি পরিবর্তন।

এই নির্বাচন শুধু কে সরকার গঠন করবে তা নির্ধারণ করবে না; এটি ঠিক করে দেবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং ভারত–চীন পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথ।

২০০৯–২০২৪ আকস্মিক পরিবর্তন:
২০০৯ সালের পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এমন একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে, যেখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেই, রাজপথে একক আধিপত্য ভেঙে পড়েছে, আর তরুণ ভোটাররা রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ১৫ বছরের টানা শাসনের পর এই নির্বাচন অনেকের কাছে ‘নতুন যুগের সূচনা। ভোটারদের বড় অংশ চাচ্ছে ২০০৯–২০২৪ একটানা ক্ষমতা থেকে আকস্মিক পরিবর্তন

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। বিরোধী রাজনীতি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে কখনও নির্বাচন বর্জন, কখনও শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, কখনও গণসমাবেশে বাধা। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন থাকলেও প্রতিযোগিতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতায় ইতিটানে। ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে, রাজনীতির মাঠে ফেরে বহুদিনের চাপা ক্ষোভ। তারই ধারাবাহিকতায় এবার এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন ২০০৯ সালের পর প্রথম সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন।

এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে মাঠে নেমেছে বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দাবি, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বিএনপি এবং সরকার গঠনের মতো আসন পাবে তারা। তবে এই পথ মোটেও মসৃণ নয়।

ইসলামপন্থী উত্থান:
ইসলামপন্থী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট এবার শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে। শুধু তাই নয়, জেন–জি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি পর্যাপ্ত সমর্থন না পেয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচন কার্যত দুটি রাজনৈতিক ধারার মুখোমুখি। একদিকে জাতীয়তাবাদী দল অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান।

ঢাকার অলিগলি থেকে জেলা শহর সবখানেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। যেখানে একসময় আওয়ামী লীগের পোস্টার ও ব্যানারে ভরা থাকত রাজপথ, সেখানে এখন চোখে পড়ছে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতীক।

ভূরাজনীতি:
এই নির্বাচন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। শেখ হাসিনার ক্ষমতার পতনের পর ভারতের প্রভাব ব্যাপক কমেছে চীনের উপস্থিতি বেড়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথে হাঁটতে চাইবে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং চীনের সঙ্গেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রাখা। অন্যদিকে জামায়াত পাকিস্তানমুখী নীতি গ্রহণ করতে পারে, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।

অর্থনীতি:
রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতিও এবারের নির্বাচনের বড় ফ্যাক্টর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, বিনিয়োগ স্থবিরতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বেড়েছে।
ভোটারদের কাছে দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি এখন প্রধান ইস্যু। মানুষ চায় এমন সরকার, যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং পকেটের চাপ কমাবে।

জেন–জি: নীরব শক্তি, বড় ভূমিকা
৩০ বছরের কম বয়সী তরুণরাই এবার নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম রাজনীতি নিয়ে কথা বলছে, প্রশ্ন তুলছে, তুলনা করছে। তারা দল নয়, নীতি দেখতে চায়।প্রথমবারের ভোটার মোহাম্মদ রাকিব বলেন,
সবাই আওয়ামী লীগে ক্লান্ত। যে সরকারই আসুক, তারা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।

১২ ফেব্রুয়ারির ভোট শুধু সরকার নির্ধারণ করবে না। এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। সফল হলে এটি গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, ব্যর্থ হলে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হতে পারে।

সংগ্রহিত