আজ পবিত্র হজ। আরাফাতের ময়দানে থাকার দিন। সেলাইবিহীন শুভ্র কাপড়ে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সারা বিশ্ব থেকে সমবেত হাজিরা আজ থাকবেন সেখানে।
‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।’ অর্থাৎ ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার’। এ ধ্বনিতে আজ মুখর থাকবে আরাফাতের ময়দান।
মিনায় মুসল্লিদের জড়ো হওয়ার মধ্য দিয়ে পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ৮ জিলহজ সোমবার সকাল থেকে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও রোববার রাতেই অনেক হাজি মিনার তাঁবুতে পৌঁছে যান। ভিড় এড়াতে কোনো কোনো মোয়াল্লেম রোববার এশার নামাজ পড়েই হজযাত্রীদের নিয়ে মিনার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে মিনা। কেউ গাড়িতে, কেউব হেঁটে সোমবার মিনায় পৌঁছান।
মিনায় যাত্রার মধ্য দিয়ে হজ পালনের সূচনা হয়, যা শেষ হবে ১২ জিলহজ শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে। অন্যান্য দেশের হাজিদের সঙ্গে এবার বাংলাদেশের ৭৯ হাজার ১৬৪ জন হাজিও সোমবার সারা দিন মিনার তাঁবুতে অবস্থান করেছেন।
তাঁবুর এই শহর মুখরিত হয়ে উঠেছিল ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে। সারা দিন ও রাত তারা মিনায় কাটান ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে। আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় মশগুল ছিলেন জিকির ও তালবিয়াতে।
মিনায় পৌঁছে হজযাত্রীরা ফজর থেকে শুরু করে এশা অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন নিজ নিজ তাঁবুতে। ৯ জিলহজ (মঙ্গলবার) সূর্যোদয়ের পর হজযাত্রীদের আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা থাকলেও সোমবার রাতেই অনেককে নিয়ে যান মুয়াল্লিমের দায়িত্বশীলরা।
পবিত্র হজ ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। আর্থিকভাবে সমর্থ এবং শারীরিকভাবে সক্ষম পুরুষ ও নারীর জন্য তা ফরজ। এবার যারা হজে এসেছেন, তারা আজ সূর্যোদয়ের পর সমবেত হবেন মিনা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে বিদায় হজের স্মৃতিবিজড়িত আরাফাতের ময়দানে।
আল্লাহর কাছে হাজিরা দিয়ে আত্মশুদ্ধি, মাগফিরাত ও রহমত চাইতে আসা মুসলমানরা আজ জড়ো হয়েছেন আরাফাতের ময়দানে, যাকে হজের মূল অনুষ্ঠান বলা হয়।
তিনদিকে পাহাড়ঘেরা প্রায় চার বর্গমাইল আয়তনের এ বিশাল সমতল মাঠের এক প্রান্তে জাবালে রহমত। অর্থাৎ রহমতের পাহাড়। ১৪শ বছরের বেশি সময় আগে এখানেই শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) দিয়েছিলেন তাঁর বিদায় হজের ভাষণ। এ পাহাড়টিকে কেউ কেউ দোয়ার পাহাড়ও বলে থাকেন। বলা হয়ে থাকে, আদি পিতা আদম (আ.) ও আদি মাতা হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে পুনর্মিলনের পর এই আরাফাতে এসে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।
এই আরাফাতে উপস্থিত না হলে হজ পূর্ণ হয় না। তাই হজে এসে যারা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদেরও অ্যাম্বুলেন্সে করে আজ আনা হবে এখানে।
ইসলামী রীতি অনুযায়ী, জিলহজের নবম দিনটি আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে ইবাদতে কাটানোই হলো হজ।
এখানে মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেবেন খতিব। আরাফাতের ময়দানের একপ্রান্তে মসজিদে নামিরা থেকে এ বছর হজের খুতবা দেবেন মসজিদে নববির প্রধান ইমাম ও খতিব শায়েখ আলি বিন আবদুর রহমান আল-হুযাইফি। একই সঙ্গে মসজিদে নামিরাতে নামাজও পড়াবেন তিনি।
তার প্রদত্ত সেই খুতবার বাংলা অনুবাদ করবেন ড. মুহাম্মদ খলীলুর রহমান, ড. আ ফ ম ওয়াহিদুর রহমান, মুবিনুর রহমান ফারুক ও নাজমুস সাকিব। তারা সবাই মক্কার উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটিতে বিভিন্ন সময়ে পড়াশোনা করেছেন।
ইসলামের বিধান অনুসারে আজ সূর্যাস্তের পর আরাফাত থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় গিয়ে রাতযাপন ও পাথর সংগ্রহ করবেন হাজিরা। ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরবেন তারা।
মিনায় প্রত্যাবর্তনের পর হাজিদের ১০ জিলহজ পর্যায়ক্রমে তিনটি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, আল্লাহর উদ্দেশে পশু কুরবানি ও মাথা মুণ্ডন করা। এরপর ১১ জিলহজ তিনটি শয়তানকে ২১টি পাথর মেরে হাজিরা তাওয়াফে জিয়ারত করবেন। তাওয়াফে জিয়ারতের মাধ্যমে হজের সবকটি ফরজ কাজ সম্পন্ন হবে।
তাওয়াফে জিয়ারত শেষ করে হাজিরা আবারও মিনায় চলে আসবেন এবং রাত্রিযাপন করবেন। ১২ জিলহজ তিনটি শয়তানকে প্রতীকী ২১টি পাথর নিক্ষেপ করে সূর্যাস্তের আগে হাজিরা মক্কায় চলে আসবেন। সবশেষে কাবা শরিফকে বিদায়ি তাওয়াফের মধ্য দিয়ে শেষ হবে হজের আনুষ্ঠানিকতা।
মিনা ও আরাফাতসহ পবিত্র স্থানগুলোয় এখন তীব্র দাবদাহ বিরাজ করছে। সৌদি আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তীব্র গরম থেকে হাজিদের সুরক্ষা দিতে সৌদি সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। পবিত্র স্থানগুলোয় ছায়া নিশ্চিত করতে বাড়তি শেড নির্মাণ, মিস্ট ফ্যান বা কৃত্রিম কুয়াশা তৈরির পাখা এবং পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সেই সঙ্গে হাজিদের চিকিৎসাসেবা দিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে মেডিকেল টিম ও ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল। গরমের কারণে অসুস্থতা এড়াতে হাজিদের ছাতা ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্বেগ আর তীব্র গরমের মধ্যেই সৌদি আরবে চলছে হজের আনুষ্ঠানিকতা, যাতে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫ লাখের বেশি মুসলমান।
চলতি বছর নুসুক কার্ড ছাড়া কেউ হজ করতে পারবেন না। হজের অনুমতি নেই-এমন কোনো ব্যক্তিকে পরিবহণ করা হলে পরিবহণকারীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার সৌদি রিয়াল জরিমানা করা হবে। মিনা ও আরাফাতে হাজিদের তাঁবুতে নুসুক কার্ড ছাড়া কাউকে পাওয়া গেলে অর্থদণ্ড আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিজিটাল এই নুসুক কার্ডে সংশ্লিষ্ট হজযাত্রীর প্রয়োজনীয় সব তথ্য থাকে। হজের জন্য মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা, মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে চাইলে এই কার্ড অবশ্যই দেখাতে হবে।
Reporter Name 























