নিজস্ব প্রতিনিধি :
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার প্রাণ হিসেবে পরিচিত ডাকাতিয়া নদীর পানি বর্তমানে দূষিত ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদীর তীরে বসবাসকারী হাজারো মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও দুর্ভোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক কালবৈশাখী ঝড়, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে নদীর আশপাশের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পচনশীল ফসল, ময়লা-আবর্জনা ও বিভিন্ন বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে পানি দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে নদীর পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর বিভিন্ন অংশে পানির রং পরিবর্তিত হয়ে ময়লাযুক্ত অবস্থায় রয়েছে। অনেক স্থানে ভেসে বেড়াচ্ছে পচা উদ্ভিদ, আগাছা ও গৃহস্থালির বর্জ্য। নদীর পানি ব্যবহার করে গোসল, কাপড় ধোয়া কিংবা গৃহস্থালির অন্যান্য কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেকেই চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগ নিয়ে আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন।
নদীর পাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, “কিছুদিন আগে কালবৈশাখী ঝড় ও বন্যার কারণে নদীর পানি অনেক বেড়ে যায়। এতে নদীর আশপাশের ফসলি জমির ফসল পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেই পচা ফসল ও ময়লা-আবর্জনা নদীর পানির সাথে মিশে যায়। যার কারণে ডাকাতিয়া নদীর পানি এখন দূষিত হয়ে পড়েছে। আমরা এই পানি ব্যবহার করতে পারছি না।”তিনি আরও বলেন, “আগে নদীর পানি অনেক পরিষ্কার ছিল। মানুষ মাছ ধরত, গোসল করত, নানা কাজে ব্যবহার করত। এখন পানির দুর্গন্ধের কারণে নদীর কাছে দাঁড়ানোও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।”
স্থানীয় সমাজসেবক ও সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম সিফাত বলেন, “ডাকাতিয়া নদী শুধু একটি নদী নয়, এটি হাজীগঞ্জের মানুষের জীবনের সাথে জড়িত। কিন্তু দিন দিন এই নদী দূষণের শিকার হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একদিকে যেমন ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই নদী আরও ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।”
হাজীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি খালেকুজ্জামান শামীম বলেন, “ডাকাতিয়া নদী রক্ষায় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে। নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং সচেতনতা বাড়াতে হবে। নদীকে বাঁচাতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”তিনি আরও বলেন, “একসময় এই নদী ছিল হাজীগঞ্জের মানুষের অর্থনীতি ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে নদীর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। নদী দূষণের ফলে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।”
হাজীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক স্থায়ী কাউন্সিলর সুমন তপাদার বলেন, “নদীর পানির এমন অবস্থা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব থাকলেও মানুষের অসচেতন আচরণও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমরা যদি নদী রক্ষায় সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।” তিনি প্রশাসনের প্রতি দ্রুত নদী পরিষ্কার ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা তোফায়েল আহাম্মদ শেখ বলেন, “নদীর পানির দূষণের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি। বিভিন্ন স্থানে পানি দূষণের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পৌরসভা থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”তিনি আরও বলেন, “প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতায় নদী পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। জনগণকেও সচেতন হতে হবে এবং নদীতে যত্রতত্র ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে।”
হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন বলেন, “ডাকাতিয়া নদীর পানি দূষণের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নদীর পানির গুণগত মানের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “নদী রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীতে বর্জ্য ফেলা, পলিথিন ও ক্ষতিকর পদার্থ নিক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। আমরা পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”এদিকে নদীপাড়ের বাসিন্দারা দ্রুত নদী পরিষ্কার ও পানি দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, ডাকাতিয়া নদী শুধু একটি জলধারা নয়, এটি হাজীগঞ্জের পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও নদী রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। নদী দূষণ রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নিয়মিত নদী পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি।
Reporter Name 
























