হাজীগঞ্জ উপজেলার ৩ নং ওয়ার্ড সদর উত্তর ইউনিয়নের সুহিলপুর গ্রাম। এ গ্রামের মিয়াজি বাড়ি সংলগ্ন উত্তর মাঠে চোখ জুড়ানো সবুজ আর সোনালি ধানের সমারোহ। দিগন্তজোড়া এই ৮৬ একর জমিতে প্রতি বছর কয়েক হাজার মণ ধান ফলে। কিন্তু এই সমৃদ্ধির গল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম অবর্ণনীয় কষ্টের চিত্র। একটি মাত্র বক্স কালভার্ট বা স্থায়ী সেতুর অভাবে কৃষকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলা এখন জীবন-মরণ লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
মাঠ আর লোকালয়ের মাঝে বয়ে চলা খালটি পার হওয়ার জন্য নেই কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। ফলে জরাজীর্ণ একটি বাঁশের সাঁকোই এখন কয়েকশ কৃষকের একমাত্র ভরসা। আর এই সাঁকো দিয়ে ধান পার করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অসহায় কৃষকরা।
মাঠ ভরা ফসল, চোখে জল সুহিলপুর গ্রামের উত্তর মাঠে ধান কাটার উৎসব শুরু হলেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। মিয়াজি বাড়ির পাশের এই বিশাল মাঠে চলতি মৌসুমেও ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু সেই ধান মাঠ থেকে বাড়িতে আনা যেন এক দুঃস্বপ্নের নাম। মাঠ থেকে ধান কেটে আঁটি বেঁধে কাঁধে করে নিয়ে আসতে হয় প্রায় আধা কিলোমিটার পথ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নড়বড়ে একটি বাঁশের সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কৃষকরা ধানের ভার বহন করছেন। সাঁকোটি এতোটাই সরু যে, দুজন মানুষ একসঙ্গে যাতায়াত করা অসম্ভব। ধানের ভারী বোঝা নিয়ে সাঁকোতে পা রাখলেই তা দুলতে থাকে। একটু ভারসাম্য হারালেই ধানসহ কৃষক পড়ে যাচ্ছেন খালের পানিতে।
কৃষকদের আর্তনাদ: “আমাদের দেখার কেউ নেই”
মাঠের ধান ঘরে তুলছিলেন ষাটোর্ধ্ব কৃষক আব্দুল হাই, দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, “বাবা, সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়া ধান ফলাই। কিন্তু এই ধান যখন বাড়ি নিমু, তখন মনে হয় এর চেয়ে মরণ ভালো। এই বাঁশের সাঁকো দিয়া দুই মণ ধানের ভার লইয়া হাঁটা যে কত কষ্টের, তা ওপরওয়ালা ছাড়া কেউ বুঝে না। কতবার যে মানুষ খালের পানিতে পইড়া ধান নষ্ট করছে, তার হিসাব নাই।”
আরেক জন কৃষক হানিফ মিয়াজি বলেন, “এখানে একটা বক্স কালভার্ট হওয়া খুব জরুরি, জনপ্রতিনিধিরা ভোটের সময় অনেক কথা দেয়, কিন্তু ভোটের পর আমাদের এই কষ্টের কথা কেউ মনে রাখে না। ৮৬ একর জমির ফসল পার করতে আমাদের যে পরিমাণ টাকা আর শ্রম বাড়তি খরচ হয়, তাতে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়।”
অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে কৃষিশ্রমিক ও মালিকরা একটি স্থায়ী কালভার্ট না থাকায় কেবল শারীরিক কষ্টই নয়, চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।
সমতল রাস্তা বা কালভার্ট থাকলে যেখানে ট্রলি বা ভ্যানে করে অল্প সময়ে ধান নেওয়া যেত, সেখানে এখন শ্রমিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে সুহিলপুর ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো.আব্দুর রহিম বলেন, এ ৮৬ একর জমিতে ধান চাষ করা কৃষকরা নিম্ন বর্নিত সমস্যা গুলো মোকাবিলা করেন,
শ্রমিক সংকট: দুর্গম পথ আর নড়বড়ে সাঁকোর কারণে অনেক শ্রমিক এই মাঠে কাজ করতে চান না। যারা আসেন, তারা দ্বিগুণ মজুরি দাবি করেন।
ফসল নষ্ট: বৃষ্টির দিনে সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে যায়। তখন ধান নিয়ে পার হতে গিয়ে প্রায়ই ধানের আঁটি পানিতে পড়ে ভিজে যায়, যা পরে বাজারমূল্য হারিয়ে ফেলে।
দীর্ঘদিনের অবহেলা ও জনপ্রতিনিধিদের নিরব ভূমিকায় সুহিলপুর গ্রামের , মিয়াজি বাড়ি সংলগ্ন এই খালে একটি বক্স কালভার্ট হয়নি,অথচ এটি নির্মাণের দাবি দীর্ঘ কয়েক দশকের। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসন পর্যন্ত বারবার ধরণা দিলেও আশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলেনি। আমি মনে করি, ৮৬ একর জমির বিশাল এই উৎপাদন অঞ্চলটি অবহেলার কারণে দিন দিন চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অনেক কৃষক যাতায়াত কষ্টের ভয়ে চাষাবাদ কমিয়ে দেওয়ার চিন্তাও করছেন।
এছাড়া স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সরকার যেখানে কৃষিকে আধুনিকায়ন করার কথা বলছে এবং ‘এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না’ বলে ঘোষণা দিচ্ছে, সেখানে সুহিলপুরের মতো একটি উর্বর এলাকায় কালভার্টের অভাব থাকা দুঃখজনক।
এখানে একটি বক্স কালভার্ট জরুরি, কারণ একটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করলে-
১. ৮৬ একর জমির ধান দ্রুত এবং কম খরচে ঘরে তোলা সম্ভব হবে।
২. কৃষকরা পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার বা ট্রাক্টর সহজেই মাঠে নিতে পারবেন।
৩. যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হলে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে।
৪. বর্ষা মৌসুমে পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত হবে, ফলে জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হবে না।
এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে,সুহিলপুর মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাও. ছিফাত উল্লাহ বলেন, সুহিলপুর গ্রামের এই অসহায় কৃষকদের দাবি এখন একটাই—মিয়াজি বাড়ি সংলগ্ন উত্তর মাঠে যাওয়ার পথে ওই খালের ওপর দ্রুত একটি স্থায়ী বক্স কালভার্ট নির্মাণ। তারা চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনের সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
এ গ্রামের মুরুব্বি হাজী আব্দুল হাই মস্টার বলেন, “আমরা কোনো বিলাসবহুল ব্রিজ চাই না। আমরা শুধু চাই আমাদের উৎপাদিত ফসলটুকু নিরাপদে বাড়িতে নেওয়ার একটা ব্যবস্থা। এই ৮৬ একর জমির ধান শুধু আমাদের না, এটা দেশের সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের।”
এ ছাড়া এ সাঁকো দিয়ে শুকনো মৌশুমে, সুহিলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,সুহিলপুর উচ্চবিদ্যালয়, এবং সুহিলপুর এ বিএস ফাযিল ডিগ্রি মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীরা,যাতায়াত করে, এজন্য সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে,আমি মনে করি।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষক। কিন্তু হাজীগঞ্জের সুহিলপুর গ্রামের চিত্র বলে দেয়, তৃণমূলের কৃষকরা আজও কতটা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা দেশের খাদ্য জোগান দিচ্ছেন, তাদের সামান্য একটি বক্স কালভার্টের জন্য বছরের পর বছর হাহাকার করতে হওয়াটা আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার জন্য একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।
প্রশাসন কি এবার সুহিলপুরের এই অসহায় কৃষকদের চোখের পানি মুছতে এগিয়ে আসবে? নাকি ৮৬ একর জমির সোনালি স্বপ্ন চিরকাল এই নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোতেই ঝুলে থাকবে? উত্তরটা সময়ের হাতে, তবে কৃষকদের ধৈর্য আর দীর্ঘশ্বাস এখন সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।তাই এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য
সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষে হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এস.এম.চিশতী।। 






















