সুজন দাস:
চাঁদপুর সদর উপজেলার চরমেশা এলাকায় অবস্থিত শ্রীশ্রী কালী মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ৫ম বাৎসরিক শ্রীশ্রী বিশ্বশান্তি গীতাযজ্ঞ। “গীতার আলো, ওঁ শ্রীকৃষ্ণন্তু ভগবান স্বয়ম্—ঘরে ঘরে জ্বালো” এই মহতী শ্লোগানকে ধারণ করে ১৭ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার দিনব্যাপী ধর্মীয় এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। চরমেশা শ্রীশ্রী ভক্তিবেদান্ত গীতা স্কুল ও বৈদিক শিক্ষালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ গীতাযজ্ঞে ভক্ত-অনুরাগীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে পুরো এলাকা এক আধ্যাত্মিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
সকালে ঠিক ৮টায় বিশ্বশান্তি গীতাযজ্ঞের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ভক্তরা মন্দির প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন। গীতা পাঠ, কীর্তন ও ভজনের মধ্য দিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে ভক্তিময় ও পবিত্র। গীতার বাণী প্রচার ও মানবকল্যাণ কামনায় আয়োজিত এই যজ্ঞে অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রার্থনা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন অঞ্চলের খ্যাতনামা সাধু-সন্ন্যাসী ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শ্রীমৎ ভবানন্দ চৈতন্য ব্রহ্মচারী, শ্মশানকালী মাতৃ মন্দির সেবাশ্রম, চট্টগ্রাম; শ্রীমৎ স্বামী কৃষ্ণানন্দ পুরী মহারাজ, অধ্যক্ষ, শ্রীশ্রী সর্বমঙ্গলা কালীধাম, চট্টগ্রাম; বিশিষ্ট গীতা পাঠক ও বাউল শিল্পী শ্রী নান্টু দেবনাথ; ঢাকার স্বামীবাগ থেকে আগত শ্রী দীনেশ চন্দ্র সরকার এবং শ্রী পলাশ রায়।
গীতাযজ্ঞ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শ্রীমৎ ধ্রুব চৈতন্য, সভাপতি, বাংলাদেশ লোকনাথ গীতা প্রচার সংঘ ও শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির, স্বামীবাগ, ঢাকা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি শ্রী রতন চন্দ্র দাস।
আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সভাপতিত্ব করেন শ্রীধাম চন্দ্র দাস (জয়), সভাপতি, চরমেশা শ্রীশ্রী ভক্তিবেদান্ত গীতা স্কুল ও বৈদিক শিক্ষালয়। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক অর্জুন দাস। তাঁদের তত্ত্বাবধানে পুরো অনুষ্ঠান সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানে চাঁদপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ এবং জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব যোগ করে। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে গীতার শিক্ষা ও মানবজীবনে এর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, গীতা শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটি মানবজীবনের পথনির্দেশক। বর্তমান বিশ্বে অশান্তি, হিংসা ও বিভেদের মধ্যে গীতার বাণী মানুষকে শান্তি ও সহমর্মিতার পথে পরিচালিত করতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মের মাঝে নৈতিকতা, মানবতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিয়মিত গীতা পাঠ ও ধর্মীয় চর্চার মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
দুপুর ১টায় মহাপ্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। হাজারো ভক্ত-অনুরাগী একসঙ্গে মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন। এতে ভক্তদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্যতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত দেখা যায়।
দিনব্যাপী এই গীতাযজ্ঞে ধর্মীয় সংগীত, ভজন ও কীর্তনের আয়োজন ছিল। ভক্তরা গভীর মনোযোগ দিয়ে গীতা পাঠ ও ধর্মীয় আলোচনা শোনেন এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করেন। পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, যা অংশগ্রহণকারীদের মাঝে এক ভিন্নধর্মী আনন্দের সঞ্চার করে।
সবশেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আগত সকল অতিথি, সাধু-সন্ন্যাসী ও ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। তারা ভবিষ্যতেও এ ধরনের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এই বিশ্বশান্তি গীতাযজ্ঞ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ছিল মানবকল্যাণ, সম্প্রীতি ও বিশ্বশান্তির এক অনন্য বার্তা বহনকারী আয়োজন—যা উপস্থিত সকলের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
Reporter Name 























