ঢাকা ১০:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাজীগঞ্জে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি, পদোন্নতির পরও বহাল, স্থানীয়দের ক্ষোভ

ঘুষ গ্রহণের ছবি ভিডিও থেকে নেয়া

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার একাধিক অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তার আগের কর্মস্থল বরিশালের নলছিটি উপজেলায় যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বর্তমান কর্মস্থলেও।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বরিশালের নলছিটি উপজেলায় কর্মরত থাকাকালে ইকবাল কবির স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। এ সুযোগে তিনি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সে সময় থেকেই ওঠে।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। পরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান চালায় এবং একটি গণশুনানিও আয়োজন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাকে নলছিটি থেকে বদলি করে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায় পাঠানো হয়।

গত বছরের ৫ অক্টোবর হাজীগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই নতুন করে নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ঠিকাদারদের একটি অংশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও করেছেন একাধিক ঠিকাদার ও এলাকাবাসী।

স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্মাণকাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট ‘সমঝোতা’ করতে হয়। তা না হলে কাজ পাওয়া বা বিল উত্তোলন কঠিন হয়ে পড়ে।”

গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) উপজেলার ৬ নং বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নের এন্নাতলি গ্রামে একটি সড়ক নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়কটির নির্মাণকাজে ধীরগতি এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছিল।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়রা প্রকৌশলী ইকবাল কবির ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নূরনবীকে ঘেরাও করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রকৌশলী নিজ কক্ষের বাথরুমে আশ্রয় নেন। কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে তাদের সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।

এলাকাবাসীর একজন বলেন, “আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু নিম্নমানের কাজ মেনে নেব না। বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।”
বক্তব্য নেই অভিযুক্ত প্রকৌশলীর

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী ইকবাল কবিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি এবং খুদে বার্তারও কোনো জবাব দেননি।

দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নলছিটিতে কর্মরত অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছিল। তবে সেই অনুসন্ধানের ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তারা আরও জানান, হাজীগঞ্জে তার বিরুদ্ধে নতুন করে যেসব অভিযোগ উঠছে, সেগুলো লিখিতভাবে পাওয়া গেলে কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

এতসব অভিযোগের মাঝেও সম্প্রতি ইকবাল কবির জেলা প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। তবে পদোন্নতি পেলেও তিনি এখনো হাজীগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ‘জুন ক্লোজিং’ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বর্তমান কর্মস্থলেই থাকবেন। এরপর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তারা বলেন, “একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

আপন কিডস স্পোকেন সেন্টারের বার্ষিক পিকনিক ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত

হাজীগঞ্জে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি, পদোন্নতির পরও বহাল, স্থানীয়দের ক্ষোভ

Update Time : ০৮:২৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার একাধিক অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তার আগের কর্মস্থল বরিশালের নলছিটি উপজেলায় যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বর্তমান কর্মস্থলেও।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বরিশালের নলছিটি উপজেলায় কর্মরত থাকাকালে ইকবাল কবির স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। এ সুযোগে তিনি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সে সময় থেকেই ওঠে।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। পরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান চালায় এবং একটি গণশুনানিও আয়োজন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাকে নলছিটি থেকে বদলি করে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায় পাঠানো হয়।

গত বছরের ৫ অক্টোবর হাজীগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই নতুন করে নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ঠিকাদারদের একটি অংশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও করেছেন একাধিক ঠিকাদার ও এলাকাবাসী।

স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্মাণকাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট ‘সমঝোতা’ করতে হয়। তা না হলে কাজ পাওয়া বা বিল উত্তোলন কঠিন হয়ে পড়ে।”

গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) উপজেলার ৬ নং বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নের এন্নাতলি গ্রামে একটি সড়ক নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়কটির নির্মাণকাজে ধীরগতি এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছিল।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়রা প্রকৌশলী ইকবাল কবির ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নূরনবীকে ঘেরাও করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রকৌশলী নিজ কক্ষের বাথরুমে আশ্রয় নেন। কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে তাদের সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।

এলাকাবাসীর একজন বলেন, “আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু নিম্নমানের কাজ মেনে নেব না। বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।”
বক্তব্য নেই অভিযুক্ত প্রকৌশলীর

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী ইকবাল কবিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি এবং খুদে বার্তারও কোনো জবাব দেননি।

দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নলছিটিতে কর্মরত অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছিল। তবে সেই অনুসন্ধানের ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তারা আরও জানান, হাজীগঞ্জে তার বিরুদ্ধে নতুন করে যেসব অভিযোগ উঠছে, সেগুলো লিখিতভাবে পাওয়া গেলে কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

এতসব অভিযোগের মাঝেও সম্প্রতি ইকবাল কবির জেলা প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। তবে পদোন্নতি পেলেও তিনি এখনো হাজীগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ‘জুন ক্লোজিং’ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বর্তমান কর্মস্থলেই থাকবেন। এরপর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তারা বলেন, “একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে।”