ঢাকা ০৫:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দাদন না নিলেও নিয়মিত কমিশন দিতে হয় মেঘনাপাড়ের জেলেদের

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৩০:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
  • ৪৯ Time View

ছবি-ত্রিনদী

পদ্মা মেঘনায় কমেছে ইলিশের প্রাচুর্য। টানাটানি করে সংসার চালান জেলেরা। আয়ের চাইতে ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে দাদনের ভেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না তাঁরা। আবার দাদন না নিলেও মাছ বিক্রিতে মহাজনদের কমিশন দিতে হয়। বাধ্য হয়ে এখনো তারা একাধিক মহাজন থেকে দাদন নিয়ে নদীতে নামছেন ইলিশ সহ অন্যান্য মাছ আহরণ করতে। কীভাবে দাদনের এই পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসবেন তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না জেলেরা।

সম্প্রতি চাঁদপুর সদরের আনন্দ বাজার, দোকানঘর, সাখুয়া ও বহরিয়া এলাকার দাদনদার এবং জেলেদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।

দাদন নিয়ে নদীতে মাছ ধরা এই পদ্ধতি কবে থেকে শুরু হয়েছে সঠিক সময় কেউ বলতে পারছে না। তবে যারা এখন জেলে পেশায় জড়িত তাদের শুরুতে অর্থাৎ ২৫ থেকে ৩০ বছর পূর্বে দাদনের পরিমান ছিলো খুবই কম। অনেকেই ৫০০টাকা দাদন নিয়ে শুরু করেছেন এখন নিচ্ছেন ৫০ হাজার থেকে ১লাখ টাকা।

সদরের সাখুয়া গ্রামের জেলে ওসমান ঢালী বলেন, তিনি প্রায় ৩০ বছর পূর্বে নৌকা প্রস্তুত করতে ৫০০টাকা দাদন নেন। এখন তার পরিমাণ অর্ধলাখ টাকা। তবে তখন তার দুটি মাছ ধরার নৌকা থাকলেও এখন একটি নৌকা দিয়ে মাছ ধরেন। দাদন বন্ধ করছেন না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দাদন না নিলেও মাছ বিক্রি করতে এসে মহাজনদের আড়তে ১০% কমিশন দিতে হয়।

একই এলাকার একাধিক জেলের একই ধরণের বক্তব্য। তবে তারা দাদন ছাড়াও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণে টাকা নিয়ে জাল নৌকা প্রস্তুত করতে কাজে লাগান। মাছ বিক্রি করেই তাদের এই ঋণ পরিশোধ করতে হয়।

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ও সাগরে মাছ ধরেন মো. হানু গাজী (৩৬)। তিনি বলেন, তার দুটি মাছ ধরার নৌকায় ১০জন কাজ করে। তিনি দাদন নিয়েছেন ৪ মহাজন থেকে। নিজ জেলা ছাড়াও হাতিয়া চেয়ারম্যানঘাট ও বরিশালের একটি ঘাট থেকে দাদন নিয়েছেন। সাগরে মাছ ধরতে গেলে ওই এলাকার নেতাদের পতাকা ছাড়া নদীতে মাছ ধরা যায় না। সাগরের নিয়ন্ত্রণে থাকে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

তিনি আরো বলেন, ইচ্ছে করলেই দাদন থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। কারণ নদীতে ইলিশ কম। কারেন্টজাল দিয়ে নদীতে মাছ ধরলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে। জামিন নিতে টাকা লাগে। ওই সময় মহাজনরা গিয়ে জামিনে টাকা খরচ করে। নতুন করে আবার টাকা বিনিয়োগ করতে হয় জাল কিনতে। যার ফলে দাদনের পরিমান প্রতিবছরই বাড়তে থাকে।

লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া ইলিশের আড়তে বসেন পাঁচ মহাজন। এর মধ্যে সোলেমান মাঝি দুই শতাধিক জেলেকে দাদন দিয়েছেন। পাশের আড়তগুলোতে বসেন শহীদ বেপারী, কালু মাঝি, মুকসুদ মিজি ও শামীম মাজি।

মহাজন বিল্লাল মাঝি বলেন, ৫০ থেকে ১লাখ টাকা দাদন নেয় জেলেরা। বিনিময়ে আমরা তাদের বিক্রি মাছ থেকে ৫% কমিশন নেই। তারা যেমন আমাদের কাছ থেকে দাদন নেয়, তারা তাদের নৌকায় যেসব জেলেরা কাজ করে তাদেরকে দাদন দেয়। ওইসব জেলে যাতে অন্য নৌকায় চলে না যায়।

সোলেমান মাঝির ব্যবসা পরিচালনা করেন তার ছেলে মো. রাব্বি। রাব্বি বলেন, জেলেরা মূলত যেখানে মাছ ধরে সেখান থেকেই দাদন নেয়। ওই এলাকায় মাছ ধরে ওই মহাজনের কাছে মাছ বিক্রি করে। তাদেরকে মাছ বিক্রির জন্য বাধ্য করা হয় না।

চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, চাঁদপুরের নৌ সীমানায় প্রায় অর্ধলক্ষাধিক নিবন্ধিত জেলে। এসব জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরীর জন্য মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে বেশ কয়েক বছর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ার জন্য। যাতে করে তারা ঋণ ও দাদনের ভেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। জেলেরা নিজেরে সচেতন না হলে স্বচ্ছল হতে কষ্টকর হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

কচুয়ায় নিখোঁজ স্কুল ছাত্রকে হত্যা করে হাত-পা কেটে নির্জন জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়: হত্যাকাণ্ড জড়িত গ্ৰেফতার-২

দাদন না নিলেও নিয়মিত কমিশন দিতে হয় মেঘনাপাড়ের জেলেদের

Update Time : ০৯:৩০:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

পদ্মা মেঘনায় কমেছে ইলিশের প্রাচুর্য। টানাটানি করে সংসার চালান জেলেরা। আয়ের চাইতে ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে দাদনের ভেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না তাঁরা। আবার দাদন না নিলেও মাছ বিক্রিতে মহাজনদের কমিশন দিতে হয়। বাধ্য হয়ে এখনো তারা একাধিক মহাজন থেকে দাদন নিয়ে নদীতে নামছেন ইলিশ সহ অন্যান্য মাছ আহরণ করতে। কীভাবে দাদনের এই পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসবেন তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না জেলেরা।

সম্প্রতি চাঁদপুর সদরের আনন্দ বাজার, দোকানঘর, সাখুয়া ও বহরিয়া এলাকার দাদনদার এবং জেলেদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।

দাদন নিয়ে নদীতে মাছ ধরা এই পদ্ধতি কবে থেকে শুরু হয়েছে সঠিক সময় কেউ বলতে পারছে না। তবে যারা এখন জেলে পেশায় জড়িত তাদের শুরুতে অর্থাৎ ২৫ থেকে ৩০ বছর পূর্বে দাদনের পরিমান ছিলো খুবই কম। অনেকেই ৫০০টাকা দাদন নিয়ে শুরু করেছেন এখন নিচ্ছেন ৫০ হাজার থেকে ১লাখ টাকা।

সদরের সাখুয়া গ্রামের জেলে ওসমান ঢালী বলেন, তিনি প্রায় ৩০ বছর পূর্বে নৌকা প্রস্তুত করতে ৫০০টাকা দাদন নেন। এখন তার পরিমাণ অর্ধলাখ টাকা। তবে তখন তার দুটি মাছ ধরার নৌকা থাকলেও এখন একটি নৌকা দিয়ে মাছ ধরেন। দাদন বন্ধ করছেন না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দাদন না নিলেও মাছ বিক্রি করতে এসে মহাজনদের আড়তে ১০% কমিশন দিতে হয়।

একই এলাকার একাধিক জেলের একই ধরণের বক্তব্য। তবে তারা দাদন ছাড়াও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণে টাকা নিয়ে জাল নৌকা প্রস্তুত করতে কাজে লাগান। মাছ বিক্রি করেই তাদের এই ঋণ পরিশোধ করতে হয়।

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ও সাগরে মাছ ধরেন মো. হানু গাজী (৩৬)। তিনি বলেন, তার দুটি মাছ ধরার নৌকায় ১০জন কাজ করে। তিনি দাদন নিয়েছেন ৪ মহাজন থেকে। নিজ জেলা ছাড়াও হাতিয়া চেয়ারম্যানঘাট ও বরিশালের একটি ঘাট থেকে দাদন নিয়েছেন। সাগরে মাছ ধরতে গেলে ওই এলাকার নেতাদের পতাকা ছাড়া নদীতে মাছ ধরা যায় না। সাগরের নিয়ন্ত্রণে থাকে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

তিনি আরো বলেন, ইচ্ছে করলেই দাদন থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। কারণ নদীতে ইলিশ কম। কারেন্টজাল দিয়ে নদীতে মাছ ধরলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে। জামিন নিতে টাকা লাগে। ওই সময় মহাজনরা গিয়ে জামিনে টাকা খরচ করে। নতুন করে আবার টাকা বিনিয়োগ করতে হয় জাল কিনতে। যার ফলে দাদনের পরিমান প্রতিবছরই বাড়তে থাকে।

লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া ইলিশের আড়তে বসেন পাঁচ মহাজন। এর মধ্যে সোলেমান মাঝি দুই শতাধিক জেলেকে দাদন দিয়েছেন। পাশের আড়তগুলোতে বসেন শহীদ বেপারী, কালু মাঝি, মুকসুদ মিজি ও শামীম মাজি।

মহাজন বিল্লাল মাঝি বলেন, ৫০ থেকে ১লাখ টাকা দাদন নেয় জেলেরা। বিনিময়ে আমরা তাদের বিক্রি মাছ থেকে ৫% কমিশন নেই। তারা যেমন আমাদের কাছ থেকে দাদন নেয়, তারা তাদের নৌকায় যেসব জেলেরা কাজ করে তাদেরকে দাদন দেয়। ওইসব জেলে যাতে অন্য নৌকায় চলে না যায়।

সোলেমান মাঝির ব্যবসা পরিচালনা করেন তার ছেলে মো. রাব্বি। রাব্বি বলেন, জেলেরা মূলত যেখানে মাছ ধরে সেখান থেকেই দাদন নেয়। ওই এলাকায় মাছ ধরে ওই মহাজনের কাছে মাছ বিক্রি করে। তাদেরকে মাছ বিক্রির জন্য বাধ্য করা হয় না।

চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, চাঁদপুরের নৌ সীমানায় প্রায় অর্ধলক্ষাধিক নিবন্ধিত জেলে। এসব জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরীর জন্য মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে বেশ কয়েক বছর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ার জন্য। যাতে করে তারা ঋণ ও দাদনের ভেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। জেলেরা নিজেরে সচেতন না হলে স্বচ্ছল হতে কষ্টকর হবে।