ঢাকা ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাজিরা খাতায় শিক্ষিকার স্বাক্ষর, ক্লাস নিচ্ছেন দাখিল পাশ ছেলে

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:২৭:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
  • ৭ Time View

ছবি-ত্রিনদী

নিজে অসুস্থতার অজুহাতে শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকলেও হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর করছেন মা, আর তার পরিবর্তে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন সদ্য দাখিল পাশ কিশোর ছেলে। ফরিদগঞ্জের ১৫২ নং দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ফারহানা আক্তারের প্রত্যক্ষ মদদে দীর্ঘ দিন ধরে চলা এমন চরম স্বেচ্ছাচারীতা, প্রশাসনিক অনিয়ম ও প্রতারণার চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে প্রশিক্ষণবিহীন বহিরাগতকে দিয়ে পাঠদান করানোয় একদিকে যেমন শিক্ষার মান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সকাল গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় ১০টা। দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে। শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠ দিচ্ছেন এক কিশোর। দৃশ্যপটটি বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও, একটু গভীরে খোঁজ নিতেই বেরিয়ে এলো এক বিস্ময়কর তথ্য। পাঠদানরত ওই কিশোর বিদ্যালয়ের কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক নন, বরং ওই বিদ্যালয়েরই শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের ছেলে মিরাজুন্নবী সিয়াম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরাজুন্নবী সিয়াম নিজেও একজন শিক্ষার্থী। স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে সদ্য দাখিল পাস করা এই তরুণ বর্তমানে ঢাকার দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসায় আলিম প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। নিজের পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছেন তিনি।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত কয়েক মাস ধরেই নিয়মিতভাবে শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের পরিবর্তে তার ছেলেকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন— একজন সদ্য দাখিল পাস করা কিশোর, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ নেই, সে কীভাবে একটি সরকারি বিদ্যালয়ের মতো সংবেদনশীল জায়গায় শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করে? নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, “অভিজ্ঞ শিক্ষকের জায়গায় যদি অপরিপক্ব ছেলে ক্লাস নেয়, তবে আমাদের সন্তানদের শিক্ষার ভিত্তিই তো নষ্ট হয়ে যাবে।”

অভিযুক্ত শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের দাবি, তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন সময়ে বিশ্রামে ছিলেন। চিকিৎসার জন্য তিনি দেশ ও বিদেশেও গিয়েছেন। তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, অসুস্থতার কারণে তিনি পাঠদানে অক্ষম হলেও প্রতিদিন স্কুলে এসে হাজিরা খাতায় ঠিকই স্বাক্ষর করে যেতেন। সহকর্মীরাও নিশ্চিত করেছেন যে, ফাতেমা বেগম স্কুলে এসে হাজিরা খাতায় সই করলেও শ্রেণিকক্ষে যেতেন না। তার পরিবর্তে পাঠদান করতেন ছেলে সিয়াম।

​প্রশ্ন উঠেছে, যদি তিনি স্বাক্ষর করার জন্য স্কুলে আসতে পারেন, তবে পাঠদান কেন করতে পারবেন না? আর যদি সত্যিই অসুস্থ হতেন, তবে সরকারি বিধি অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করে কেন ছুটি নিলেন না? স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এবং প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশেই তিনি এই অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাঠদান শেষে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হওয়ার পর মিরাজুন্নবী সিয়াম অকপটে স্বীকার করেন, “মায়ের অসুস্থতার জন্য আমি ক্লাস নিচ্ছি। গত বছরও প্রায় দেড়-দুই মাস আমি ক্লাস করিয়েছি, এখনো করাচ্ছি।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

কচুয়ায় মাদক, কিশোর গ্যাং দমন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে বদলে দিয়েছে ওসি মোঃ আজিজুল ইসলাম

হাজিরা খাতায় শিক্ষিকার স্বাক্ষর, ক্লাস নিচ্ছেন দাখিল পাশ ছেলে

Update Time : ১০:২৭:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

নিজে অসুস্থতার অজুহাতে শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকলেও হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর করছেন মা, আর তার পরিবর্তে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন সদ্য দাখিল পাশ কিশোর ছেলে। ফরিদগঞ্জের ১৫২ নং দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ফারহানা আক্তারের প্রত্যক্ষ মদদে দীর্ঘ দিন ধরে চলা এমন চরম স্বেচ্ছাচারীতা, প্রশাসনিক অনিয়ম ও প্রতারণার চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে প্রশিক্ষণবিহীন বহিরাগতকে দিয়ে পাঠদান করানোয় একদিকে যেমন শিক্ষার মান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সকাল গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় ১০টা। দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে। শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠ দিচ্ছেন এক কিশোর। দৃশ্যপটটি বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও, একটু গভীরে খোঁজ নিতেই বেরিয়ে এলো এক বিস্ময়কর তথ্য। পাঠদানরত ওই কিশোর বিদ্যালয়ের কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক নন, বরং ওই বিদ্যালয়েরই শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের ছেলে মিরাজুন্নবী সিয়াম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরাজুন্নবী সিয়াম নিজেও একজন শিক্ষার্থী। স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে সদ্য দাখিল পাস করা এই তরুণ বর্তমানে ঢাকার দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসায় আলিম প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। নিজের পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছেন তিনি।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত কয়েক মাস ধরেই নিয়মিতভাবে শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের পরিবর্তে তার ছেলেকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন— একজন সদ্য দাখিল পাস করা কিশোর, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ নেই, সে কীভাবে একটি সরকারি বিদ্যালয়ের মতো সংবেদনশীল জায়গায় শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করে? নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, “অভিজ্ঞ শিক্ষকের জায়গায় যদি অপরিপক্ব ছেলে ক্লাস নেয়, তবে আমাদের সন্তানদের শিক্ষার ভিত্তিই তো নষ্ট হয়ে যাবে।”

অভিযুক্ত শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের দাবি, তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন সময়ে বিশ্রামে ছিলেন। চিকিৎসার জন্য তিনি দেশ ও বিদেশেও গিয়েছেন। তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, অসুস্থতার কারণে তিনি পাঠদানে অক্ষম হলেও প্রতিদিন স্কুলে এসে হাজিরা খাতায় ঠিকই স্বাক্ষর করে যেতেন। সহকর্মীরাও নিশ্চিত করেছেন যে, ফাতেমা বেগম স্কুলে এসে হাজিরা খাতায় সই করলেও শ্রেণিকক্ষে যেতেন না। তার পরিবর্তে পাঠদান করতেন ছেলে সিয়াম।

​প্রশ্ন উঠেছে, যদি তিনি স্বাক্ষর করার জন্য স্কুলে আসতে পারেন, তবে পাঠদান কেন করতে পারবেন না? আর যদি সত্যিই অসুস্থ হতেন, তবে সরকারি বিধি অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করে কেন ছুটি নিলেন না? স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এবং প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশেই তিনি এই অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাঠদান শেষে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হওয়ার পর মিরাজুন্নবী সিয়াম অকপটে স্বীকার করেন, “মায়ের অসুস্থতার জন্য আমি ক্লাস নিচ্ছি। গত বছরও প্রায় দেড়-দুই মাস আমি ক্লাস করিয়েছি, এখনো করাচ্ছি।”