ঢাকা ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় স্ত্রীকে তালাক দিল শিবির কর্মী!

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৩১:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২৫ Time View

ছবি-ত্রিনদী

ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার অভিযোগে রানু আক্তার (রুনা আক্তার নামেও পরিচিত) নামে এক গৃহবধূকে তালাক দিয়েছেন শিবিরের এক কর্মী। দুই সন্তানের জননী ওই নারী অভিযোগ করেন, তার স্বামী নূর মোহাম্মদ সুমন শিবিরের সক্রিয় কর্মী। নিষেধ অমান্য করে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ায় তাকে তালাক দেওয়া হয়েছে। সোমবার দুপুরে বিষয়টি প্রকাশ পায়। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের পাগলীরকুল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

অভিযোগ রয়েছে, আইনজীবীর সহায়তায় আদালতের মাধ্যমে তালাক দিয়ে রোববার দুপুরে অজ্ঞাত স্থান থেকে মুঠোফোনে লোকজনকে বিষয়টি জানান নূর মোহাম্মদ সুমন। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী রুনা আক্তার জানান, ভোটের আগের রাতে স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করেন, কোথায় ভোট দেবেন। জবাবে তিনি বলেন, ছোটকাল থেকে দেখে আসছেন তার বাবা ধানের শীষে ভোট দেন, তিনিও ধানের শীষে ভোট দেবেন। এ কথা শোনার পর স্বামী তাকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেন। পরে স্বামী বাড়ি থেকে চলে গেলে তিনি রাজষপুর আলী আজ্জম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে ধানের শীষে ভোট দেন। রাতে বাড়ি ফিরে তিনি স্বামীকে বিষয়টি জানান। পরদিন ভোরে স্বামী ঘুম থেকে উঠে তাকে ও তাদের বড় ছেলেকে মারধর করেন এবং বাড়ি থেকে জমির কাগজপত্র ও দলিল নিয়ে বেরিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। প্রতিবেশীদের কাছে জানিয়েছেন, আদালতের মাধ্যমে তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন।

নূর মোহাম্মদ সুমনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করা সম্ভব না হওয়ায় তাকে তালাক দিয়েছেন। ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে তালাক দেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তিনি আরও দাবি করেন, রুনা আক্তার ভোটার নন, তাই তিনি কীভাবে ভোট দিয়েছেন—এ প্রশ্ন তোলেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেনী নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে তালাক রেজিস্ট্রি করে ডাকযোগে তালাকনামা পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জানা যায়, ২০১৪ সালের ৭ নভেম্বর চিথলিয়া ইউনিয়নের নোয়াপুর গ্রামের নূর আহমেদের মেয়ে রুনা আক্তার মুন্নিকে বিয়ে করেন একই ইউনিয়নের পাগলীরকুল গ্রামের জসীম উদ্দিনের ছেলে নূর মোহাম্মদ সুমন। তাদের সংসারে মোবারক হোসেন মুরাদ (১০) ও মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসেন (৩) নামে দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। রাজষপুর বাজারে ‘ভাই ভাই স্টোর’ নামে সুমনের একটি দোকান রয়েছে।

এদিকে প্রাপ্ত এফিডেভিটের কপিতে দেখা যায়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেনীর নোটারি পাবলিক কার্যালয়ের আইনজীবী রবিউল হক রবির স্বাক্ষরে নূর মোহাম্মদ সুমনের তালাকসংক্রান্ত এফিডেভিট ইস্যু করা হয়। তাকে শনাক্তকারী হিসেবে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মীর মোশাররফ হোসেন মানিকের নাম উল্লেখ রয়েছে। এফিডেভিট নম্বর ১৭০। তালাকনামায় রুনা আক্তারের বিরুদ্ধে সংসারজীবন পালনে অক্ষমতা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও অবাধ্যতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

নূর মোহাম্মদ সুমনের প্রতিবেশী কাউসার আলম বলেন, সুমন বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর রুনা আক্তার বিষয়টি তাকে জানান। তার দুই অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা উচিত ছিল। অপর প্রতিবেশী কৃষক আবদুল কাদের বলেন, গত রোববার সুমন তাকে ফোন করে জানান, আদালত থেকে তালাকনামা পাঠানো হয়েছে এবং রুনাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলতে বলেন।

ঘটনাটি জানাজানি হলে চিথলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মুন্সী নজরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, সাধারণ সম্পাদক মাস্টার শেখ আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিমসহ দলীয় নেতাকর্মীরা সুমনের বাড়িতে যান। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল হালিম মানিক বলেন, ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অভিযোগে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া নিন্দনীয়। এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক অবক্ষয় বাড়তে পারে।

এর আগে, জাতীয় নির্বাচনে স্বামীর নিষেধ অমান্য করে ভোট দিতে যাওয়ায় ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও ধর্মপুর বাঁশতলা এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন কাওসার তার স্ত্রী বিবি জহুরাকে তালাক দেন। এ ঘটনায় জহুরা ও তার তিন সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে নগদ অর্থসহায়তা ও নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথাও জানানো হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

এলাকায় আসেননি, কোনো প্রচার–প্রচারণা চালাননি, তবু পেয়েছেন ১৩৮ ভোট

ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় স্ত্রীকে তালাক দিল শিবির কর্মী!

Update Time : ১০:৩১:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার অভিযোগে রানু আক্তার (রুনা আক্তার নামেও পরিচিত) নামে এক গৃহবধূকে তালাক দিয়েছেন শিবিরের এক কর্মী। দুই সন্তানের জননী ওই নারী অভিযোগ করেন, তার স্বামী নূর মোহাম্মদ সুমন শিবিরের সক্রিয় কর্মী। নিষেধ অমান্য করে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ায় তাকে তালাক দেওয়া হয়েছে। সোমবার দুপুরে বিষয়টি প্রকাশ পায়। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের পাগলীরকুল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

অভিযোগ রয়েছে, আইনজীবীর সহায়তায় আদালতের মাধ্যমে তালাক দিয়ে রোববার দুপুরে অজ্ঞাত স্থান থেকে মুঠোফোনে লোকজনকে বিষয়টি জানান নূর মোহাম্মদ সুমন। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী রুনা আক্তার জানান, ভোটের আগের রাতে স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করেন, কোথায় ভোট দেবেন। জবাবে তিনি বলেন, ছোটকাল থেকে দেখে আসছেন তার বাবা ধানের শীষে ভোট দেন, তিনিও ধানের শীষে ভোট দেবেন। এ কথা শোনার পর স্বামী তাকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেন। পরে স্বামী বাড়ি থেকে চলে গেলে তিনি রাজষপুর আলী আজ্জম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে ধানের শীষে ভোট দেন। রাতে বাড়ি ফিরে তিনি স্বামীকে বিষয়টি জানান। পরদিন ভোরে স্বামী ঘুম থেকে উঠে তাকে ও তাদের বড় ছেলেকে মারধর করেন এবং বাড়ি থেকে জমির কাগজপত্র ও দলিল নিয়ে বেরিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। প্রতিবেশীদের কাছে জানিয়েছেন, আদালতের মাধ্যমে তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন।

নূর মোহাম্মদ সুমনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করা সম্ভব না হওয়ায় তাকে তালাক দিয়েছেন। ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে তালাক দেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তিনি আরও দাবি করেন, রুনা আক্তার ভোটার নন, তাই তিনি কীভাবে ভোট দিয়েছেন—এ প্রশ্ন তোলেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেনী নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে তালাক রেজিস্ট্রি করে ডাকযোগে তালাকনামা পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জানা যায়, ২০১৪ সালের ৭ নভেম্বর চিথলিয়া ইউনিয়নের নোয়াপুর গ্রামের নূর আহমেদের মেয়ে রুনা আক্তার মুন্নিকে বিয়ে করেন একই ইউনিয়নের পাগলীরকুল গ্রামের জসীম উদ্দিনের ছেলে নূর মোহাম্মদ সুমন। তাদের সংসারে মোবারক হোসেন মুরাদ (১০) ও মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসেন (৩) নামে দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। রাজষপুর বাজারে ‘ভাই ভাই স্টোর’ নামে সুমনের একটি দোকান রয়েছে।

এদিকে প্রাপ্ত এফিডেভিটের কপিতে দেখা যায়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেনীর নোটারি পাবলিক কার্যালয়ের আইনজীবী রবিউল হক রবির স্বাক্ষরে নূর মোহাম্মদ সুমনের তালাকসংক্রান্ত এফিডেভিট ইস্যু করা হয়। তাকে শনাক্তকারী হিসেবে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মীর মোশাররফ হোসেন মানিকের নাম উল্লেখ রয়েছে। এফিডেভিট নম্বর ১৭০। তালাকনামায় রুনা আক্তারের বিরুদ্ধে সংসারজীবন পালনে অক্ষমতা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও অবাধ্যতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

নূর মোহাম্মদ সুমনের প্রতিবেশী কাউসার আলম বলেন, সুমন বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর রুনা আক্তার বিষয়টি তাকে জানান। তার দুই অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা উচিত ছিল। অপর প্রতিবেশী কৃষক আবদুল কাদের বলেন, গত রোববার সুমন তাকে ফোন করে জানান, আদালত থেকে তালাকনামা পাঠানো হয়েছে এবং রুনাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলতে বলেন।

ঘটনাটি জানাজানি হলে চিথলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মুন্সী নজরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর, সাধারণ সম্পাদক মাস্টার শেখ আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিমসহ দলীয় নেতাকর্মীরা সুমনের বাড়িতে যান। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল হালিম মানিক বলেন, ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অভিযোগে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া নিন্দনীয়। এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক অবক্ষয় বাড়তে পারে।

এর আগে, জাতীয় নির্বাচনে স্বামীর নিষেধ অমান্য করে ভোট দিতে যাওয়ায় ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও ধর্মপুর বাঁশতলা এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন কাওসার তার স্ত্রী বিবি জহুরাকে তালাক দেন। এ ঘটনায় জহুরা ও তার তিন সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে নগদ অর্থসহায়তা ও নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথাও জানানো হয়।