ঢাকা ০৪:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বপ্নযাত্রা

  • অনলাইন ডেস্ক:
  • Update Time : ০৮:৪৮:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২৪ Time View

ছবি-ত্রিনদী

 যেন এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। ১৭ বছরের নির্বাসন জীবন কাটিয়ে রাজধানীর পূর্বাচলের তিনশ ফিটের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি যখন বলেছিলেন-‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ (আমার একটি পরিকল্পনা আছে), তখনই মানুষ বুঝে গিয়েছিল তারেক রহমানের ওপর আস্থা রাখা যায়। মানুষ তার দলকে উজাড় করে দিয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। মঙ্গলবার তারই আনুষ্ঠানিকতা হলো এক ব্যতিক্রমী আয়োজনে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন। তার শপথের পর প্রথমে মন্ত্রী এবং পরে প্রতিমন্ত্রীরা শপথগ্রহণ করেন। রেওয়াজ ভেঙে বঙ্গভবনের বদলে এবারের শপথ অনুষ্ঠান হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। বিকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথ পড়ান। নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন ২৫ জন ও প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। যার মধ্যে ৪০ জনই নতুন মুখ। এতে স্থান পেয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতারাও। মিত্র দলের দুইজনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পাহাড়সম অভিপ্রায় নিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হলো।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর শুরু হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা। যে যাত্রায় থাকছে দেশের অনেক প্রত্যাশা।

সকালে জাতীয় সংসদে সংসদ-সদস্যরা শপথ নেন। শপথ নেওয়ার পর সংসদীয় দলের সভায় তারেক রহমানকে সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত করেন বিএনপি দলীয় সংসদ-সদস্যরা। এদিকে গতকাল রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার মাজার জিয়ারত করেন। অন্যদিকে আজ সচিবালয়ে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেলা ৩টায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন তিনি। অন্যদিকে প্রস্তুত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীয় কার্যালয়ও।

সাদা জামা ও কোট-প্যান্ট পরিহিত তারেক রহমানকে এদিন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। তিনি স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বিকাল ৩টা ৫৮ মিনিটে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করলে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানায়। এর কয়েক মিনিট পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিকাল ৪টা ৪ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন।

জাতীয় সংগীত এবং এরপর কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের নাম ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। তারেক রহমান নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে প্রথমে সরকারপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালনের এবং তারপর গোপনীয়তার শপথ নেন। সবশেষে তিনি শপথের নথিতে স্বাক্ষর করেন। নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানানোর পর মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পাওয়া নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং শপথগ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়। এরপর নতুন মন্ত্রীদের পর্যায়ক্রমে শপথ এবং গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সবশেষে প্রতিমন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করে তাদের শপথগ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়ে মঞ্চে ডাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। প্রতিমন্ত্রীদের শপথ এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর শেষে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলংকার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমবিষয়ক মন্ত্রী নালিন্দা জয়াসিতা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা (বিদায়ি) ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন মেয়ে দীনা আফরোজকে সঙ্গে নিয়ে। ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি, সংসদ-সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান এবং তাদের মেয়ে জাইমা রহমান এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

পূর্ণমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন-মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু), মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, এজেডএম জাহিদ হোসেন, খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), আবদুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মিজানুর রহমান মিনু, নিতাই রায় চৌধুরী, খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, আরিফুল হক চৌধুরী, জহির উদ্দিন স্বপন, মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট), আফরোজা খানম, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের, দীপেন দেওয়ান, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ফকির মাহবুব আনাম ও শেখ রবিউল আলম।

এরপর প্রতিমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন-এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মো. শরিফুল আলম, শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, হাবিবুর রশীদ, মো. রাজিব আহসান, মো. আব্দুল বারী, মীর শাহে আলম, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ইশরাক হোসেন, ফারজানা শারমিন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, নুরুল হক নুর, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেইন, এমএ মুহিত, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর, ববি হাজ্জাজ ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ২৪ জনের কেউই এর আগে মন্ত্রিপরিষদে দায়িত্ব পালন করেননি।

মা খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার ৯ জন ও বাকি ১৬ জন এবারই প্রথম মন্ত্রী : নতুন সরকারের ২৫ জন মন্ত্রীর মধ্যে ৯ জন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসাবে খালেদা জিয়ার সরকারে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাকি ১৬ জন এবারই প্রথম মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন। পুরোনো মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন-দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও নিতাই রায় চৌধুরী, আসাদুল হাবিব দুলু এবং আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

টেকনোক্র্যাট কোটায় চমক : টেকনোক্র্যাট কোটায় দুজন পূর্ণমন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ পেয়েছেন। পূর্ণমন্ত্রী হিসাবে রয়েছেন-হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন ও ড. খলিলুর রহমান। প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। এর মধ্যে হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কুমিল্লা-৬ সদর আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও দলীয় মনোনয়ন পাননি। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও দলীয় প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশে পরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এর পুরস্কার হিসাবে তাকে মন্ত্রী করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এর আগে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৯ আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ড. খলিলুর রহমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে নিয়োগ পান। পরে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেন। এছাড়া আমিনুল হক জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক। তিনি ঢাকা-১৬ আসন থেকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। বাংলাদেশে কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বা টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার নজির খুব কম। স্বাধীনতার পর সাবেক তারকা ফুটবলার মেজর হাফিজ উদ্দিন প্রথম মন্ত্রিত্ব পান। পরে সাবেক জাতীয় ফুটবলার আরিফ খান জয় ক্রীড়া উপমন্ত্রী হন। সেই ধারাবাহিকতায় আমিনুল হক তৃতীয় সাবেক জাতীয় ফুটবলার হিসাবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

মিত্র দলের দুজনকে প্রতিমন্ত্রী : আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির সঙ্গে থাকা মিত্রদেরও হতাশ করেননি তারেক রহমান। জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ও নুরুল হক নুরকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হন সাকি ও পটুয়াখালী-৩ থেকে নির্বাচন করে জয়ী হন নুর। এ দুজনই তাদের নিজ দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন।

এক মন্ত্রী ও এক প্রতিমন্ত্রী পেল নারী : বিএনপি সরকারের এবারের মন্ত্রিসভায় আফরোজা খানমকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। তিনি মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন। এছাড়া প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ফারজানা শারমিন। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে। ফারজানা নাটোর-১ আসন থেকে এবারের জাতীয় নির্বাচনে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জয়ী হয়। বিএনপি জোটের শরিকরা ৩টি আসন পায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

স্কাউটের ইয়ুথ ফোরামে উপস্থাপনায় আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হাজীগঞ্জ সরকারি পাইলটের শিক্ষার্থী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বপ্নযাত্রা

Update Time : ০৮:৪৮:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 যেন এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। ১৭ বছরের নির্বাসন জীবন কাটিয়ে রাজধানীর পূর্বাচলের তিনশ ফিটের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি যখন বলেছিলেন-‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ (আমার একটি পরিকল্পনা আছে), তখনই মানুষ বুঝে গিয়েছিল তারেক রহমানের ওপর আস্থা রাখা যায়। মানুষ তার দলকে উজাড় করে দিয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। মঙ্গলবার তারই আনুষ্ঠানিকতা হলো এক ব্যতিক্রমী আয়োজনে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন। তার শপথের পর প্রথমে মন্ত্রী এবং পরে প্রতিমন্ত্রীরা শপথগ্রহণ করেন। রেওয়াজ ভেঙে বঙ্গভবনের বদলে এবারের শপথ অনুষ্ঠান হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। বিকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথ পড়ান। নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন ২৫ জন ও প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। যার মধ্যে ৪০ জনই নতুন মুখ। এতে স্থান পেয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতারাও। মিত্র দলের দুইজনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পাহাড়সম অভিপ্রায় নিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হলো।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর শুরু হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা। যে যাত্রায় থাকছে দেশের অনেক প্রত্যাশা।

সকালে জাতীয় সংসদে সংসদ-সদস্যরা শপথ নেন। শপথ নেওয়ার পর সংসদীয় দলের সভায় তারেক রহমানকে সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত করেন বিএনপি দলীয় সংসদ-সদস্যরা। এদিকে গতকাল রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার মাজার জিয়ারত করেন। অন্যদিকে আজ সচিবালয়ে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেলা ৩টায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন তিনি। অন্যদিকে প্রস্তুত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীয় কার্যালয়ও।

সাদা জামা ও কোট-প্যান্ট পরিহিত তারেক রহমানকে এদিন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। তিনি স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বিকাল ৩টা ৫৮ মিনিটে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করলে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানায়। এর কয়েক মিনিট পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিকাল ৪টা ৪ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন।

জাতীয় সংগীত এবং এরপর কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের নাম ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। তারেক রহমান নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে প্রথমে সরকারপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালনের এবং তারপর গোপনীয়তার শপথ নেন। সবশেষে তিনি শপথের নথিতে স্বাক্ষর করেন। নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানানোর পর মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পাওয়া নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং শপথগ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়। এরপর নতুন মন্ত্রীদের পর্যায়ক্রমে শপথ এবং গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সবশেষে প্রতিমন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করে তাদের শপথগ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়ে মঞ্চে ডাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। প্রতিমন্ত্রীদের শপথ এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর শেষে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলংকার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমবিষয়ক মন্ত্রী নালিন্দা জয়াসিতা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা (বিদায়ি) ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন মেয়ে দীনা আফরোজকে সঙ্গে নিয়ে। ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি, সংসদ-সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান এবং তাদের মেয়ে জাইমা রহমান এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

পূর্ণমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন-মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু), মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, এজেডএম জাহিদ হোসেন, খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), আবদুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মিজানুর রহমান মিনু, নিতাই রায় চৌধুরী, খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, আরিফুল হক চৌধুরী, জহির উদ্দিন স্বপন, মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট), আফরোজা খানম, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের, দীপেন দেওয়ান, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ফকির মাহবুব আনাম ও শেখ রবিউল আলম।

এরপর প্রতিমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন-এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মো. শরিফুল আলম, শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, হাবিবুর রশীদ, মো. রাজিব আহসান, মো. আব্দুল বারী, মীর শাহে আলম, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ইশরাক হোসেন, ফারজানা শারমিন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, নুরুল হক নুর, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেইন, এমএ মুহিত, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর, ববি হাজ্জাজ ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ২৪ জনের কেউই এর আগে মন্ত্রিপরিষদে দায়িত্ব পালন করেননি।

মা খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার ৯ জন ও বাকি ১৬ জন এবারই প্রথম মন্ত্রী : নতুন সরকারের ২৫ জন মন্ত্রীর মধ্যে ৯ জন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসাবে খালেদা জিয়ার সরকারে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাকি ১৬ জন এবারই প্রথম মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন। পুরোনো মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন-দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও নিতাই রায় চৌধুরী, আসাদুল হাবিব দুলু এবং আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

টেকনোক্র্যাট কোটায় চমক : টেকনোক্র্যাট কোটায় দুজন পূর্ণমন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ পেয়েছেন। পূর্ণমন্ত্রী হিসাবে রয়েছেন-হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন ও ড. খলিলুর রহমান। প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। এর মধ্যে হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কুমিল্লা-৬ সদর আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও দলীয় মনোনয়ন পাননি। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও দলীয় প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশে পরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এর পুরস্কার হিসাবে তাকে মন্ত্রী করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এর আগে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৯ আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ড. খলিলুর রহমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে নিয়োগ পান। পরে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেন। এছাড়া আমিনুল হক জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক। তিনি ঢাকা-১৬ আসন থেকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। বাংলাদেশে কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বা টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার নজির খুব কম। স্বাধীনতার পর সাবেক তারকা ফুটবলার মেজর হাফিজ উদ্দিন প্রথম মন্ত্রিত্ব পান। পরে সাবেক জাতীয় ফুটবলার আরিফ খান জয় ক্রীড়া উপমন্ত্রী হন। সেই ধারাবাহিকতায় আমিনুল হক তৃতীয় সাবেক জাতীয় ফুটবলার হিসাবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

মিত্র দলের দুজনকে প্রতিমন্ত্রী : আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির সঙ্গে থাকা মিত্রদেরও হতাশ করেননি তারেক রহমান। জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ও নুরুল হক নুরকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হন সাকি ও পটুয়াখালী-৩ থেকে নির্বাচন করে জয়ী হন নুর। এ দুজনই তাদের নিজ দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন।

এক মন্ত্রী ও এক প্রতিমন্ত্রী পেল নারী : বিএনপি সরকারের এবারের মন্ত্রিসভায় আফরোজা খানমকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। তিনি মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন। এছাড়া প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ফারজানা শারমিন। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে। ফারজানা নাটোর-১ আসন থেকে এবারের জাতীয় নির্বাচনে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে জয়ী হয়। বিএনপি জোটের শরিকরা ৩টি আসন পায়।