ঢাকা ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৫৬ বছরের প্রথা ভেঙে ভোটকেন্দ্রে রূপসার নারী পরিবর্তনের গল্প বললেন চাঁদপুরের ডিসি

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:০৭:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
  • ৫৪ Time View

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নাজমুল ইসলাম সরকার

একসময় ভোটের দিন এলে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের অনেক বাড়ির উঠান ছিল নিস্তব্ধ। পুরুষেরা ভোট দিতে গেলেও ঘরের ভেতরেই থাকতেন নারীরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই নীরবতা টিকে ছিল প্রায় ৫৬ বছর। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বদলে গেছে সেই দৃশ্য। দীর্ঘদিনের অলিখিত নিয়ম ভেঙে প্রথমবারের মতো অনেক নারী ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন।

এই পরিবর্তনের গল্প গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নাজমুল ইসলাম সরকার। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে হণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একটা মা বা নারীকে বুঝিয়ে বা মোটিভেট করতে পারলে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র পরিবর্তনে অনন্য অবদান রাখা সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি, ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন নারী জাগরণের এক নতুন উদাহরণ হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কিংবা বেগম সুফিয়া কামাল যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো হেঁটেই এসে দেখতেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে এখানে কত বড় পরিবর্তন এসেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনে কমবেশি ভোটার উপস্থিতি ছিল এবং সেখানে নারীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে ব্যতিক্রম ছিল চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন। কথিত এক পীরের নির্দেশের কারণে প্রায় ৫৬ বছর ধরে ওই এলাকার নারীরা জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনেই ভোট দিতে যেতেন না।

অবশেষে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেই দীর্ঘদিনের প্রথা ভাঙে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউনিয়নটির প্রায় ১০ হাজার নারী ভোটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার নারী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা প্রায় ৫০ শতাংশের সমান।

জেলা প্রশাসক জানান, ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি প্রথমে সরেজমিনে এলাকায় যান এবং নারীদের নিয়ে একটি সমাবেশের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি বর্তমান বাংলাদেশে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রযাত্রার বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তাদের আশ্বস্ত করেন, ভোটকেন্দ্রে গেলে নিরাপত্তা ও সম্মান দুটোই নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নারীদের জন্য আলাদা একটি বিশেষ বুথ রাখা হয়, যেখানে দায়িত্বে ছিলেন নারী কর্মকর্তারা। এতে নারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। শুধু নারীদের সঙ্গেই নয়, এলাকার ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করেন তিনি। নির্বাচনের আগে দুটি সভা করা হয়। একটি নারী কেন্দ্রিক এবং অন্যটি মসজিদ ও মাদ্রাসার ইমামদের নিয়ে।

ডিসি বলেন, ইমাম সাহেবদের বোঝানোটা আমার কাছে অনেকটা অস্ত্রের মতো মনে হয়েছে। কারণ ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি মানুষের মনে দ্রুত প্রভাব ফেলে। ভোটের আগের দিন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে পুরো এলাকা পরিদর্শন করা হয়, যাতে মানুষ বুঝতে পারে এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের একটি সুযোগ।

নির্বাচনের দিন সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যেই গণমাধ্যমকর্মীরা তাকে ফোন করে জানান, নারীরা ভোটকেন্দ্রে আসছেন। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, দীর্ঘদিনের একটি অচলাবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক সাংবাদিক ভাই আমাকে বলেছেন, আমরা দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এই বিষয়টি নিয়ে লিখেছি। এবার সেই গল্পের ইতি টানলেন আপনি। আগে যেখানে নারীরা ভোটকেন্দ্রে যেতেন না, সেখানে এবার প্রায় ১০ হাজার নারী ভোটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার নারী ভোট দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক মনে করেন, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীদের এই অংশগ্রহণ কেবল একটি নির্বাচনী ঘটনা নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক।

তিনি বলেন, নারীরা সমাজের মা জাতি। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। ভবিষ্যতে যদি নারী অগ্রযাত্রার নতুন কোনো উদাহরণ প্রয়োজন হয়, তাহলে ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের কথাই বলা হবে।

তার ভাষায়, এই অর্জন তার জীবনের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। সব কিছু হয়তো একদিন ভুলে যাব, কিন্তু রূপসা ইউনিয়নের এই পরিবর্তনের গল্প ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গত, স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে যে ১৯৬৯ সালে ভারতের জয়নপুর থেকে পীর মওদুদ হাসান জয়েনপুরী (রহ.) চাঁদপুরের রূপসা এলাকায় আসেন। সে সময় দেশে কলেরা মহামারি চলছিল। তখন নারীদের পর্দা রক্ষা ও ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রচলিত আছে। যদিও এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্দেশ স্থানীয় সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছিল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

ঢাকাস্থ ১নং রাজারগাঁও ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী ফোরামের উদ্যোগে ইফতার ও দোয়া

৫৬ বছরের প্রথা ভেঙে ভোটকেন্দ্রে রূপসার নারী পরিবর্তনের গল্প বললেন চাঁদপুরের ডিসি

Update Time : ১০:০৭:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

একসময় ভোটের দিন এলে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের অনেক বাড়ির উঠান ছিল নিস্তব্ধ। পুরুষেরা ভোট দিতে গেলেও ঘরের ভেতরেই থাকতেন নারীরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই নীরবতা টিকে ছিল প্রায় ৫৬ বছর। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বদলে গেছে সেই দৃশ্য। দীর্ঘদিনের অলিখিত নিয়ম ভেঙে প্রথমবারের মতো অনেক নারী ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন।

এই পরিবর্তনের গল্প গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নাজমুল ইসলাম সরকার। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে হণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একটা মা বা নারীকে বুঝিয়ে বা মোটিভেট করতে পারলে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র পরিবর্তনে অনন্য অবদান রাখা সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি, ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন নারী জাগরণের এক নতুন উদাহরণ হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কিংবা বেগম সুফিয়া কামাল যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো হেঁটেই এসে দেখতেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে এখানে কত বড় পরিবর্তন এসেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনে কমবেশি ভোটার উপস্থিতি ছিল এবং সেখানে নারীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে ব্যতিক্রম ছিল চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন। কথিত এক পীরের নির্দেশের কারণে প্রায় ৫৬ বছর ধরে ওই এলাকার নারীরা জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনেই ভোট দিতে যেতেন না।

অবশেষে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেই দীর্ঘদিনের প্রথা ভাঙে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউনিয়নটির প্রায় ১০ হাজার নারী ভোটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার নারী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা প্রায় ৫০ শতাংশের সমান।

জেলা প্রশাসক জানান, ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি প্রথমে সরেজমিনে এলাকায় যান এবং নারীদের নিয়ে একটি সমাবেশের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি বর্তমান বাংলাদেশে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রযাত্রার বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তাদের আশ্বস্ত করেন, ভোটকেন্দ্রে গেলে নিরাপত্তা ও সম্মান দুটোই নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নারীদের জন্য আলাদা একটি বিশেষ বুথ রাখা হয়, যেখানে দায়িত্বে ছিলেন নারী কর্মকর্তারা। এতে নারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। শুধু নারীদের সঙ্গেই নয়, এলাকার ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করেন তিনি। নির্বাচনের আগে দুটি সভা করা হয়। একটি নারী কেন্দ্রিক এবং অন্যটি মসজিদ ও মাদ্রাসার ইমামদের নিয়ে।

ডিসি বলেন, ইমাম সাহেবদের বোঝানোটা আমার কাছে অনেকটা অস্ত্রের মতো মনে হয়েছে। কারণ ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি মানুষের মনে দ্রুত প্রভাব ফেলে। ভোটের আগের দিন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে পুরো এলাকা পরিদর্শন করা হয়, যাতে মানুষ বুঝতে পারে এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের একটি সুযোগ।

নির্বাচনের দিন সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যেই গণমাধ্যমকর্মীরা তাকে ফোন করে জানান, নারীরা ভোটকেন্দ্রে আসছেন। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, দীর্ঘদিনের একটি অচলাবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক সাংবাদিক ভাই আমাকে বলেছেন, আমরা দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এই বিষয়টি নিয়ে লিখেছি। এবার সেই গল্পের ইতি টানলেন আপনি। আগে যেখানে নারীরা ভোটকেন্দ্রে যেতেন না, সেখানে এবার প্রায় ১০ হাজার নারী ভোটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার নারী ভোট দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক মনে করেন, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীদের এই অংশগ্রহণ কেবল একটি নির্বাচনী ঘটনা নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক।

তিনি বলেন, নারীরা সমাজের মা জাতি। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। ভবিষ্যতে যদি নারী অগ্রযাত্রার নতুন কোনো উদাহরণ প্রয়োজন হয়, তাহলে ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের কথাই বলা হবে।

তার ভাষায়, এই অর্জন তার জীবনের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। সব কিছু হয়তো একদিন ভুলে যাব, কিন্তু রূপসা ইউনিয়নের এই পরিবর্তনের গল্প ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গত, স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে যে ১৯৬৯ সালে ভারতের জয়নপুর থেকে পীর মওদুদ হাসান জয়েনপুরী (রহ.) চাঁদপুরের রূপসা এলাকায় আসেন। সে সময় দেশে কলেরা মহামারি চলছিল। তখন নারীদের পর্দা রক্ষা ও ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রচলিত আছে। যদিও এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্দেশ স্থানীয় সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছিল।