ঢাকা ০৯:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্প ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’: বলছেন মার্কিন রাজনীতিকেরা-দ্যা গার্ডিয়ান

ছবি-ত্রিনদী

ইরানকে উদ্দেশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম অপমানজনক ও অকথ্য ভাষায় দেওয়া এক হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের এমন আচরণে উদ্বেগ প্রকাশ করে অনেক মার্কিন রাজনীতিক এখন তাঁর ‘মানসিক সুস্থতা’ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানান। অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় তিনি লেখেন, ‘হারামির দল, হরমুজ প্রণালি খুলে দাও। নাহলে নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।—শুধু দেখো কী হয়।’

এখানেই শেষ নয়, ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোতে আরও বড় হামলার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানে আগামীকাল মঙ্গলবার হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংসের দিন। এদিন এমন কিছু ঘটবে, যা এর আগে কেউ কোনো দিন দেখেনি। পোস্টের শেষে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর’ কথাটিও যোগ করেন।

আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে ইরানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সময়সীমা শেষ হচ্ছে। তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই সমুদ্রপথটি গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। এখন আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে ইরান এ পথটি আবার চালু না করলে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে কী পদক্ষেপ নেয়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ কাজ করছে।

আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে ইরানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলটিমেটাম শেষ হচ্ছে। তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই সমুদ্রপথটি গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথটি আবার চালুর জন্য ইরানকে একের পর এক সময়সীমা বেঁধে দিয়ে হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাঁর এই ক্ষোভের বড় একটি অংশ এখন গিয়ে পড়ছে ইউরোপীয় ও ন্যাটো মিত্রদের ওপর।

কারণ, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালি সংকটে হস্তক্ষেপ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

মিত্রদের এমন অবস্থানে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প এখন উল্টো ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। তাঁর দাবি, ইউরোপীয় দেশগুলো এই সংকটে ওয়াশিংটনকে সহযোগিতা না করে উল্টো বাধা সৃষ্টি করছে। ট্রাম্পের এমন অনমনীয় অবস্থান এবং সামরিক জোট ছেড়ে দেওয়ার হুমকিতে আটলান্টিকের দুই পারের দীর্ঘদিনের সম্পর্কে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক উপপ্রধান মেহেদি তাবাতাবায়ি গত রোববার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত ইরান প্রণালিটি খুলবে না। তিনি বলেন, ট্রানজিট ফির ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এই ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে হবে।
হরমুজ প্রণালীতে চলছে নৌযান

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে ‘পাগলামি’ আখ্যা দিয়ে গ্রিন আরও বলেন, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এখনই হস্তক্ষেপ করা উচিত। ট্রাম্পের একসময়ের ঘনিষ্ঠ এই মিত্রের এমন কঠোর অবস্থান এখন মার্কিন রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাবেক এই রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক দীর্ঘ পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি আপনাদের সবাইকে চিনি, তাঁকেও (ট্রাম্প) চিনি। তিনি এখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন এবং আপনারা সবাই এই অপরাধের অংশীদার। আমি ইরানকে সমর্থন করছি না। কিন্তু আসুন, আমরা সবাই অন্তত সত্যটা স্বীকার করি।’

মার্জোরি টেলর গ্রিনের এমন সরাসরি আক্রমণ ট্রাম্পশিবিরের ভেতরে তৈরি হওয়া ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

মার্জোরি টেলর গ্রিন তাঁর পোস্টে আরও লিখেছেন, ‘এই প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিনা উসকানিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। কয়েক দশক ধরে তারা ইরানের পরমাণু অস্ত্র নিয়ে যে মিথ্যাচার করে আসছে, সেই একই অজুহাতে এই যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি ছিল, ইরান যেকোনো মুহূর্তে পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলবে।’

সাবেক এই কংগ্রেস সদস্য সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আপনারা ভালো করেই জানেন, কার কাছে পরমাণু অস্ত্র আছে—সেটা হচ্ছে ইসরায়েল। তারা নিজেদের রক্ষা করতে পুরোপুরি সক্ষম। তাদের হয়ে যুদ্ধ করা, নিরপরাধ মানুষ ও শিশু হত্যা করা কিংবা যুদ্ধের খরচ জোগানোর কোনো প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ট্রাম্প এখন বিদ্যুৎকেন্দ্র আর সেতুতে বোমা হামলার যে হুমকি দিচ্ছেন, তাতে সাধারণ ইরানিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; অথচ এই মানুষদেরই মুক্ত করার দাবি করেছিলেন ট্রাম্প।’

দীর্ঘদিন অনুগত থাকার পর গত বছর থেকে ট্রাম্পের পাশ থেকে সরে দাঁড়াতে শুরু করেন মার্জোরি টেলর গ্রিন। গত জুনে ইরানে ট্রাম্পের হামলার কড়া সমালোচনা করেছিলেন তিনি। গ্রিনের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি—অর্থাৎ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (সবার আগে আমেরিকা) এবং বিদেশের ব্যয়বহুল যুদ্ধ এড়িয়ে চলার নীতির পুরোপুরি বিরোধী।

এদিকে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক শুমার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ট্রাম্পের এই অসংলগ্ন কথাগুলো একজন ‘উন্মাদ পাগলের’ প্রলাপের মতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন: ‘শুভ ইস্টার, যুক্তরাষ্ট্র। আপনারা যখন গির্জায় যাচ্ছেন এবং বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে উৎসব পালন করছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন উন্মাদের মতো চিৎকার করছেন।’

শুমার আরও লিখেছেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের হুমকি দিচ্ছেন এবং মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। এটাই তাঁর আসল রূপ। কিন্তু আমরা এমন নই। আমাদের দেশ আরও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।’

স্বতন্ত্র মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই আচরণকে ‘বিপজ্জনক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘ইরানে যুদ্ধ শুরুর এক মাস পার হতে না হতেই ইস্টার সানডের দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন বক্তব্য এল। এগুলো একজন বিপজ্জনক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।’

স্যান্ডার্স আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘কংগ্রেসকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। এই যুদ্ধ এখনই বন্ধ করুন।

ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালি সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের সময়সীমা এবং ইরানের এই পাল্টা শর্তের ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।

মেহেদি তাবাতাবায়ি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধের জেরে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলে নিজের চরম ‘হতাশা ও ক্ষোভ’ ঝাড়ছেন। তাঁর মতে, কোনো উপায় না পেয়েই ট্রাম্প এখন এমন অকথ্য গালিগালাজ আর আজেবাজে বকছেন।

ইরানের এই কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্পের এসব হুমকি প্রমাণ করে, তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।

সাবেক কট্টর ট্রাম্প সমর্থক এবং বর্তমানে তাঁর কড়া সমালোচক মার্জোরি টেলর গ্রিন এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা নিজেদের ‘খ্রিষ্টান’ বলে দাবি করেন, তাঁদের সবার উচিত অবিলম্বে ‘ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাওয়া’।

সিনেটর ক্রিস মারফিও প্রেসিডেন্টের এই আচরণকে পুরোপুরি ‘উন্মাদনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘আমি যদি ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে এই ইস্টার সানডেতে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে ২৫তম সংশোধনী (প্রেসিডেন্টকে অপসারণের প্রক্রিয়া) নিয়ে আলোচনা করতাম। এটি পুরোপুরি এবং চরম পর্যায়ের পাগলামি।’

মারফি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন। তিনি আরও হাজার হাজার মানুষকে হত্যার পথে হাঁটছেন।’

এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে রো খান্না বলেন, ‘আমাদের এখনই এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। আমাদের অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র—সবারই বোমা হামলা বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে আসা উচিত।’

সশস্ত্র বাহিনী কমিটির সদস্য ও ডেমোক্রেটিক সিনেটর টিম কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাঁর ‘আক্রমণাত্মক বক্তব্য কমিয়ে আনার’ আহ্বান জানিয়েছেন। এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনিও কথা বলেন।

কেইন বলেন, ট্রাম্পের এমন ভাষা ‘লজ্জাকর এবং শিশুসুলভ’। তাঁর মতে, এ ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য সেখানে দায়িত্বরত মার্কিন সেনাদের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

ইরানের বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্রে ইসরাইলের ভয়াবহ হামলা

ট্রাম্প ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’: বলছেন মার্কিন রাজনীতিকেরা-দ্যা গার্ডিয়ান

Update Time : ০৭:২০:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬

ইরানকে উদ্দেশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম অপমানজনক ও অকথ্য ভাষায় দেওয়া এক হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের এমন আচরণে উদ্বেগ প্রকাশ করে অনেক মার্কিন রাজনীতিক এখন তাঁর ‘মানসিক সুস্থতা’ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানান। অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় তিনি লেখেন, ‘হারামির দল, হরমুজ প্রণালি খুলে দাও। নাহলে নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।—শুধু দেখো কী হয়।’

এখানেই শেষ নয়, ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোতে আরও বড় হামলার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানে আগামীকাল মঙ্গলবার হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংসের দিন। এদিন এমন কিছু ঘটবে, যা এর আগে কেউ কোনো দিন দেখেনি। পোস্টের শেষে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর’ কথাটিও যোগ করেন।

আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে ইরানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সময়সীমা শেষ হচ্ছে। তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই সমুদ্রপথটি গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। এখন আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে ইরান এ পথটি আবার চালু না করলে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে কী পদক্ষেপ নেয়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ কাজ করছে।

আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে ইরানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলটিমেটাম শেষ হচ্ছে। তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই সমুদ্রপথটি গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথটি আবার চালুর জন্য ইরানকে একের পর এক সময়সীমা বেঁধে দিয়ে হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাঁর এই ক্ষোভের বড় একটি অংশ এখন গিয়ে পড়ছে ইউরোপীয় ও ন্যাটো মিত্রদের ওপর।

কারণ, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালি সংকটে হস্তক্ষেপ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

মিত্রদের এমন অবস্থানে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প এখন উল্টো ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। তাঁর দাবি, ইউরোপীয় দেশগুলো এই সংকটে ওয়াশিংটনকে সহযোগিতা না করে উল্টো বাধা সৃষ্টি করছে। ট্রাম্পের এমন অনমনীয় অবস্থান এবং সামরিক জোট ছেড়ে দেওয়ার হুমকিতে আটলান্টিকের দুই পারের দীর্ঘদিনের সম্পর্কে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক উপপ্রধান মেহেদি তাবাতাবায়ি গত রোববার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত ইরান প্রণালিটি খুলবে না। তিনি বলেন, ট্রানজিট ফির ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এই ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে হবে।
হরমুজ প্রণালীতে চলছে নৌযান

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে ‘পাগলামি’ আখ্যা দিয়ে গ্রিন আরও বলেন, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এখনই হস্তক্ষেপ করা উচিত। ট্রাম্পের একসময়ের ঘনিষ্ঠ এই মিত্রের এমন কঠোর অবস্থান এখন মার্কিন রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাবেক এই রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক দীর্ঘ পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি আপনাদের সবাইকে চিনি, তাঁকেও (ট্রাম্প) চিনি। তিনি এখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন এবং আপনারা সবাই এই অপরাধের অংশীদার। আমি ইরানকে সমর্থন করছি না। কিন্তু আসুন, আমরা সবাই অন্তত সত্যটা স্বীকার করি।’

মার্জোরি টেলর গ্রিনের এমন সরাসরি আক্রমণ ট্রাম্পশিবিরের ভেতরে তৈরি হওয়া ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

মার্জোরি টেলর গ্রিন তাঁর পোস্টে আরও লিখেছেন, ‘এই প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিনা উসকানিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। কয়েক দশক ধরে তারা ইরানের পরমাণু অস্ত্র নিয়ে যে মিথ্যাচার করে আসছে, সেই একই অজুহাতে এই যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি ছিল, ইরান যেকোনো মুহূর্তে পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলবে।’

সাবেক এই কংগ্রেস সদস্য সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আপনারা ভালো করেই জানেন, কার কাছে পরমাণু অস্ত্র আছে—সেটা হচ্ছে ইসরায়েল। তারা নিজেদের রক্ষা করতে পুরোপুরি সক্ষম। তাদের হয়ে যুদ্ধ করা, নিরপরাধ মানুষ ও শিশু হত্যা করা কিংবা যুদ্ধের খরচ জোগানোর কোনো প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ট্রাম্প এখন বিদ্যুৎকেন্দ্র আর সেতুতে বোমা হামলার যে হুমকি দিচ্ছেন, তাতে সাধারণ ইরানিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; অথচ এই মানুষদেরই মুক্ত করার দাবি করেছিলেন ট্রাম্প।’

দীর্ঘদিন অনুগত থাকার পর গত বছর থেকে ট্রাম্পের পাশ থেকে সরে দাঁড়াতে শুরু করেন মার্জোরি টেলর গ্রিন। গত জুনে ইরানে ট্রাম্পের হামলার কড়া সমালোচনা করেছিলেন তিনি। গ্রিনের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি—অর্থাৎ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (সবার আগে আমেরিকা) এবং বিদেশের ব্যয়বহুল যুদ্ধ এড়িয়ে চলার নীতির পুরোপুরি বিরোধী।

এদিকে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক শুমার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ট্রাম্পের এই অসংলগ্ন কথাগুলো একজন ‘উন্মাদ পাগলের’ প্রলাপের মতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন: ‘শুভ ইস্টার, যুক্তরাষ্ট্র। আপনারা যখন গির্জায় যাচ্ছেন এবং বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে উৎসব পালন করছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন উন্মাদের মতো চিৎকার করছেন।’

শুমার আরও লিখেছেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের হুমকি দিচ্ছেন এবং মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। এটাই তাঁর আসল রূপ। কিন্তু আমরা এমন নই। আমাদের দেশ আরও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।’

স্বতন্ত্র মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই আচরণকে ‘বিপজ্জনক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘ইরানে যুদ্ধ শুরুর এক মাস পার হতে না হতেই ইস্টার সানডের দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন বক্তব্য এল। এগুলো একজন বিপজ্জনক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।’

স্যান্ডার্স আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘কংগ্রেসকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। এই যুদ্ধ এখনই বন্ধ করুন।

ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালি সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের সময়সীমা এবং ইরানের এই পাল্টা শর্তের ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।

মেহেদি তাবাতাবায়ি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধের জেরে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলে নিজের চরম ‘হতাশা ও ক্ষোভ’ ঝাড়ছেন। তাঁর মতে, কোনো উপায় না পেয়েই ট্রাম্প এখন এমন অকথ্য গালিগালাজ আর আজেবাজে বকছেন।

ইরানের এই কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্পের এসব হুমকি প্রমাণ করে, তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন।

সাবেক কট্টর ট্রাম্প সমর্থক এবং বর্তমানে তাঁর কড়া সমালোচক মার্জোরি টেলর গ্রিন এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা নিজেদের ‘খ্রিষ্টান’ বলে দাবি করেন, তাঁদের সবার উচিত অবিলম্বে ‘ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাওয়া’।

সিনেটর ক্রিস মারফিও প্রেসিডেন্টের এই আচরণকে পুরোপুরি ‘উন্মাদনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘আমি যদি ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে এই ইস্টার সানডেতে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে ২৫তম সংশোধনী (প্রেসিডেন্টকে অপসারণের প্রক্রিয়া) নিয়ে আলোচনা করতাম। এটি পুরোপুরি এবং চরম পর্যায়ের পাগলামি।’

মারফি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন। তিনি আরও হাজার হাজার মানুষকে হত্যার পথে হাঁটছেন।’

এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে রো খান্না বলেন, ‘আমাদের এখনই এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। আমাদের অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র—সবারই বোমা হামলা বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে আসা উচিত।’

সশস্ত্র বাহিনী কমিটির সদস্য ও ডেমোক্রেটিক সিনেটর টিম কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাঁর ‘আক্রমণাত্মক বক্তব্য কমিয়ে আনার’ আহ্বান জানিয়েছেন। এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনিও কথা বলেন।

কেইন বলেন, ট্রাম্পের এমন ভাষা ‘লজ্জাকর এবং শিশুসুলভ’। তাঁর মতে, এ ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য সেখানে দায়িত্বরত মার্কিন সেনাদের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।